
শেষ হয়েছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। ফলাফল প্রকাশের পরও আলোচনা থামছে না নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনকে ঘিরে। এই আসনে বিএনপি জোটের প্রার্থী মনির কাসেমী মনোনয়ন পেলেও শেষ পর্যন্ত এনসিপি প্রার্থীর কাছে বড় ব্যবধানে পরাজিত হয়েছেন। শক্তিশালী প্রচারণা ও দলীয় সমর্থন থাকা সত্ত্বেও কেন ভরাডুবি হলো তা নিয়ে চলছে নানা বিশ্লেষণ।
স্থানীয় রাজনৈতিক বলয় ও সাধারণ ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মনোনয়ন পাওয়ার পরপরই কাসেমী বিতর্কিত হিসেবে পরিচিত কয়েকজন নেতার সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়ান। এতে বিএনপির একটি ‘ক্লিন ইমেজ’ধারী অংশ ক্ষুব্ধ হয়ে পড়ে। একই সময়ে দলের আরেকটি অংশকে নিজের বলয়ে টেনে নিতে সক্রিয় হন স্বতন্ত্রপ্রার্থী শাহ আলম। ফলে শুরু থেকেই দলীয় ভেতরে বিভাজন স্পষ্ট হয়ে ওঠে। প্রচারণা পর্বে কাসেমীর পাশে যেসব নেতাকে সামনে দেখা গেছে, তাদের অনেকের বিরুদ্ধেই রয়েছে নানা অভিযোগ। বক্তাবলী ১ নম্বর ওয়ার্ডের মেম্বার রশিদের বিরুদ্ধে আওয়ামী শাসনামলেও প্রভাব খাটিয়ে অপকর্মের অভিযোগ ও সরকার পতনের পর তা অব্যাহত রাখার ঘটনায় গ্রেফতারের ঘটনা রয়েছে বলে স্থানীয়দের দাবি। ফতুল্লা থানা স্বেচ্ছাসেবক দলের যুগ্ম আহ্বায়ক এসকে শাহিনের বিরুদ্ধেও আওয়ামী ঘনিষ্ঠদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দেওয়ার অভিযোগ শোনা যায়। তার পিএস সাদ্দাম অতীতে মাদকসহ গ্রেফতার হয়েছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।এছাড়াও জেলা মটর শ্রমীকলীগের যুগ্ম আহবায়ক রবিউল ইসলাম রয়েলকে প্রকাশ্যে শেল্টার দিচ্ছে এসকে শাহিন।
এছাড়া জেলা মৎস্যজীবী দলের সভাপতি এইচ এম হোসেনের বিরুদ্ধে দখল-বাণিজ্য,লুটপাট ও অভ্যন্তরীণ কোন্দলের অভিযোগ রয়েছে।এছাড়াও নিজ সংগঠনের নেতাদের মারধরের অভিযোগ রয়েছে , যুবদল নেতা আব্দুল খালেক টিপুর বিরুদ্ধে জুট সেক্টর নিয়ন্ত্রণ ঘিরে বিতর্ক রয়েছে, কাঠেরপুল, রামারবাগসহ আশেপাশের কারখানার ঝুটের ক্যাশিয়ার হিসেবে রয়েছেন তিনি। কৃষকদল নেতা আমির ব্যাপারীর বিরুদ্ধে শিল্পাঞ্চল সংশ্লিষ্ট প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ রয়েছে।ইটভাটা নিয়ন্ত্রন,ঝুট সেক্টর নিয়ন্ত্রনসহ নানা নেতিবাচক কর্মকান্ডে জড়িত। এ ধরনের বিষয় ভোটারদের মধ্যে নেতিবাচক বার্তা দিয়েছে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা। একইভাবে ফতুল্লা থানা মৎসজীবীদলের সভাপতি ফয়সাল ব্যাপারী , কুতুবপুর ইউনিয়ন যুবদলের সভাপতি মাসুম আহমেদ রাজ ও ফতুল্লা থানা কৃষকদলের যুগ্ম আহবায়ক ইব্রাহিমের মতো নেতাদের নামও বিভিন্ন অভিযোগের সঙ্গে জড়িয়েছে। এই ইব্রাহিম এর পূর্বেও মাদকসহ গ্রেফতার হয়েছিলেন। নির্বাচনের পুরো সময়জুড়ে এ ধরনের নেতাদের সক্রিয় উপস্থিতি সাধারণ ভোটারদের একাংশের মধ্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, “খেজুর গাছ” প্রতীকের পক্ষে ভোট চাইতে গিয়ে বিতর্কিত মুখগুলো সামনে থাকায় প্রত্যাশিত ভোট বৃদ্ধির বদলে উল্টো ভোট কমেছে। অনেক নিরপেক্ষ ও তরুণ ভোটার শেষ পর্যন্ত দূরে সরে যান।
অন্যদিকে এলাকাভিত্তিক বেশ কিছু নেতা ছিলেন, যাদের বিরুদ্ধে সরকার পতনের পর কোনো নেতিবাচক অভিযোগ ওঠেনি। জাহিদ হোসেন রোজেল, পান্না মোল্লা, এম এ আকবর, সাইফুল ইসলাম বিপ্লব, রুবেল হোসেন, মইনুল হাসান রতন, হাসান আলী ও আক্তার খন্দকারের মতো স্বচ্ছ ভাবমূর্তির নেতাদের কাসেমী নিজের বলয়ে আনতে পারেননি বলে অভিযোগ রয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই ‘ক্লিন ইমেজ’ধারী অংশকে পাশে রাখতে ব্যর্থ হওয়াই ছিল কাসেমীর বড় কৌশলগত ভুল।
সার্বিক বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, দলীয় অভ্যন্তরীণ সমন্বয়হীনতা, বিতর্কিত নেতাদের প্রাধান্য এবং ইতিবাচক ভাবমূর্তির নেতাদের দূরে সরিয়ে রাখা এই তিন কারণই নির্বাচনী ফলাফলে বড় প্রভাব ফেলেছে। শক্তিশালী প্রচারণা থাকা সত্ত্বেও জনমতের সূক্ষ্ম পরিবর্তন ধরতে না পারাই শেষ পর্যন্ত কাল হয়ে দাঁড়ায় কাসেমীর জন্য।
আপনার মতামত লিখুন :