থাইরয়েড আর প্যারাথাইরয়েডকে কি এক মনে করেন, ভুলটা জেনে নিন


Saimoon Islam প্রকাশের সময় : অগাস্ট ২৮, ২০২৬, ৩:২২ অপরাহ্ন / ১০০০ Views
থাইরয়েড আর প্যারাথাইরয়েডকে কি এক মনে করেন, ভুলটা জেনে নিন

থাইরয়েড আর প্যারাথাইরয়েডকে কি এক মনে করেন, ভুলটা জেনে নিন

নাম কাছাকাছি হলেওথাইরয়েড আর প্যারাথাইরয়েডের কাজ একেবারেই আলাদা।

 

গলার সামনের দিকে ছোট একটি প্রজাপতির মতো গ্রন্থি। নাম থাইরয়েড। এই নামটি এখন কমবেশি সবারই পরিচিত। ওজন বেড়ে যাওয়া, হঠাৎ ওজন কমে যাওয়া, সব সময় ক্লান্ত লাগা কিংবা বুক ধড়ফড় করার মতো নানা সমস্যার সঙ্গে থাইরয়েডের নাম জড়িয়ে আছে।

 

 

কিন্তু থাইরয়েডের কাছেই রয়েছে আরও কয়েকটি অতি ছোট গ্রন্থি, যাদের নাম প্যারাথাইরয়েড। নামের মধ্যে থাইরয়েড শব্দটি থাকায় অনেকেই দুটিকে একই অঙ্গ বা একই ধরনের গ্রন্থি মনে করেন। আসলে তাদের কাজ সম্পূর্ণ আলাদা।

 

থাইরয়েড মূলত শরীরের বিপাকক্রিয়া বা শরীর কত দ্রুত শক্তি ব্যবহার করবে, তা নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। আর প্যারাথাইরয়েডের প্রধান দায়িত্ব হলো রক্তে ক্যালসিয়ামের মাত্রা ঠিক রাখা। দুটি গ্রন্থি পাশাপাশি থাকলেও একটির সমস্যা হলে অন্যটি স্বাভাবিকভাবেই কাজ করতে পারে।

 

থাইরয়েড কী কাজ করে?

থাইরয়েড গলার সামনের দিকে থাকা প্রজাপতির আকৃতির একটি গ্রন্থি। এটি মূলত টি৩ (T3) ও টি৪ (T4) নামের হরমোন তৈরি করে। এই হরমোনগুলো শরীর কত দ্রুত শক্তি ব্যবহার করবে, বিপাকক্রিয়া কীভাবে চলবে, শরীরের তাপমাত্রা এবং বিভিন্ন অঙ্গের স্বাভাবিক কাজের ওপর প্রভাব ফেলে।

 

সহজভাবে বলা যায়, থাইরয়েড শরীরের কাজের গতি নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে।

 

থাইরয়েড থেকে প্রয়োজনের তুলনায় কম হরমোন তৈরি হলে হাইপোথাইরয়েডিজম হতে পারে। তখন শরীরের বিভিন্ন প্রক্রিয়া কিছুটা ধীর হয়ে যায়। ক্লান্তি, ঠান্ডা বেশি লাগা, ওজন বেড়ে যাওয়া, ত্বক শুষ্ক হয়ে যাওয়া, চুল পাতলা হওয়া, কোষ্ঠকাঠিন্য এবং মনোযোগ ধরে রাখতে সমস্যা হতে পারে।

 

অন্যদিকে থাইরয়েড বেশি সক্রিয় হলে হাইপারথাইরয়েডিজম হতে পারে। তখন ওজন কমে যাওয়া, অতিরিক্ত ঘাম, উদ্বেগ, হাত কাঁপা, ঘুমের সমস্যা এবং হৃদ্‌স্পন্দন দ্রুত বা অনিয়মিত হওয়ার মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে।

 

তবে এসব উপসর্গ দেখেই থাইরয়েডের সমস্যা নিশ্চিত করা যায় না। কারণ একই ধরনের লক্ষণ অন্য অনেক সমস্যাতেও হতে পারে। তাই চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী রক্ত পরীক্ষা করে থাইরয়েডের কার্যকারিতা দেখা হয়। সাধারণত টি এস এইচ, টি৪ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী টি৩ পরীক্ষা করা হয়।

 

তাহলে প্যারাথাইরয়েড কী?

থাইরয়েডের পেছনে সাধারণত চারটি ছোট প্যারাথাইরয়েড গ্রন্থি থাকে। এগুলোর আকার খুবই ছোট। দেখতে ছোট দানার মতো হলেও শরীরের জন্য এদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

 

প্যারাথাইরয়েড গ্রন্থি প্যারাথাইরয়েড হরমোন বা পি টি এইচ তৈরি করে। এই হরমোনের প্রধান কাজ হলো রক্তে ক্যালসিয়ামের মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করা।

 

ক্যালসিয়াম শুধু হাড় ও দাঁত শক্ত রাখার জন্য প্রয়োজন, এমনটা ভাবলে ভুল হবে। পেশির সংকোচন, স্নায়ুর সংকেত আদান-প্রদানসহ শরীরের বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ কাজের জন্য রক্তে নির্দিষ্ট মাত্রার ক্যালসিয়াম থাকা দরকার।

 

রক্তে ক্যালসিয়ামের মাত্রা কমে গেলে প্যারাথাইরয়েড হরমোন সেই মাত্রা স্বাভাবিক করতে কাজ করে। এটি হাড় থেকে ক্যালসিয়াম রক্তে আসতে সাহায্য করে, কিডনির মাধ্যমে ক্যালসিয়াম বেরিয়ে যাওয়া কমায় এবং সক্রিয় ভিটামিন ডি তৈরিতে কিডনিকে উদ্দীপিত করে। এর ফলে অন্ত্র থেকে ক্যালসিয়াম শোষণও বাড়ে।

 

অর্থাৎ থাইরয়েড যেখানে শরীরের কাজের গতি সামলাতে সাহায্য করে, প্যারাথাইরয়েড সেখানে রক্তে ক্যালসিয়ামের ভারসাম্য পাহারা দেয়।

 

প্যারাথাইরয়েডে সমস্যা হলে কী হয়?

প্যারাথাইরয়েড থেকে অতিরিক্ত হরমোন তৈরি হলে হাইপারপ্যারাথাইরয়েডিজম হতে পারে। এর ফলে রক্তে ক্যালসিয়ামের মাত্রা বেড়ে যেতে পারে। দীর্ঘদিন এমন থাকলে হাড় দুর্বল হয়ে যেতে পারে এবং কিডনিতে পাথর হওয়ার ঝুঁকি বাড়তে পারে। কিছু মানুষের ক্লান্তি, দুর্বলতা, হজমের সমস্যা বা মেজাজের পরিবর্তনও হতে পারে।

 

আবার প্যারাথাইরয়েড থেকে প্রয়োজনের তুলনায় কম হরমোন তৈরি হলে রক্তে ক্যালসিয়ামের মাত্রা কমে যেতে পারে। তখন ঠোঁট বা আঙুলের ডগায় ঝিনঝিন করা এবং পেশিতে টান বা খিঁচুনি হতে পারে। গুরুতর অবস্থায় ক্যালসিয়াম খুব কমে গেলে খিঁচুনি পর্যন্ত হতে পারে।

 

তাই শরীরে ক্যালসিয়াম কম থাকলেই শুধু খাবারে ক্যালসিয়াম কম খাওয়াকে কারণ ধরে নেওয়া ঠিক নয়। শরীর কীভাবে ক্যালসিয়াম নিয়ন্ত্রণ করছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।

 

থাইরয়েড আর প্যারাথাইরয়েডের পরীক্ষা কি একই?

না। দুটি গ্রন্থির কাজ আলাদা হওয়ায় সমস্যার অনুসন্ধানেও আলাদা পরীক্ষা করা হয়।

 

থাইরয়েডের সমস্যা সন্দেহ হলে সাধারণত টি এস এইচ, টি৪ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী টি৩ পরীক্ষা করা হয়।

অন্যদিকে প্যারাথাইরয়েডের সমস্যা সন্দেহ হলে রক্তে ক্যালসিয়াম ও প্যারাথাইরয়েড হরমোনের মাত্রা দেখা হয়। পরিস্থিতি অনুযায়ী ফসফেট, ভিটামিন ডি এবং কিডনির কার্যকারিতার পরীক্ষাও করা হতে পারে।

 

তাই কারও ক্যালসিয়াম অস্বাভাবিক হলেই থাইরয়েডের সমস্যা হয়েছে, এমনটা ধরে নেওয়া ঠিক নয়। একইভাবে থাইরয়েডের হরমোনে সমস্যা হলেই প্যারাথাইরয়েডেও সমস্যা আছে, এমন নয়।

 

একটি গ্রন্থির সমস্যা হলে অন্যটিরও কি সমস্যা হয়?

সব সময় নয়। থাইরয়েড ও প্যারাথাইরয়েড গলার একই এলাকায় খুব কাছাকাছি অবস্থান করলেও তাদের কাজ আলাদা। ফলে কারও থাইরয়েডের সমস্যা থাকতে পারে, কিন্তু প্যারাথাইরয়েড স্বাভাবিকভাবে কাজ করতে পারে। আবার প্যারাথাইরয়েডে সমস্যা থাকলেও থাইরয়েডের হরমোন স্বাভাবিক থাকতে পারে।

 

তবে থাইরয়েডের অস্ত্রোপচারের ক্ষেত্রে প্যারাথাইরয়েডের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ছোট প্যারাথাইরয়েড গ্রন্থিগুলো থাইরয়েডের খুব কাছাকাছি থাকায় অস্ত্রোপচারের সময় এগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হলে শরীরে ক্যালসিয়ামের ভারসাম্যে সমস্যা হতে পারে। এ কারণেই থাইরয়েডের অস্ত্রোপচারের সময় প্যারাথাইরয়েড গ্রন্থিগুলো যতটা সম্ভব সংরক্ষণ করা হয়।

 

সহজে মনে রাখবেন যেভাবে

থাইরয়েড আর প্যারাথাইরয়েডকে মনে রাখার একটি সহজ উপায় আছে।

 

থাইরয়েড মানে শরীরের গতি। থাইরয়েডের তৈরি টি৩ ও টি৪ হরমোন শরীরের বিপাকক্রিয়া ও শক্তি ব্যবহারের ওপর গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলে।

 

প্যারাথাইরয়েড মানে ক্যালসিয়ামের পাহারাদার।

 

প্যারাথাইরয়েড থেকে তৈরি পি টি এইচ রক্তে ক্যালসিয়ামের মাত্রা ঠিক রাখতে কাজ করে।

 

মনে রাখবেন, নাম কাছাকাছি হলেও দুটির কাজ একেবারেই আলাদা।

 

উপসর্গ থাকলেই নিজে থেকে সিদ্ধান্ত নয়

ক্লান্তি, দুর্বলতা, ওজনের পরিবর্তন, পেশিতে টান বা মেজাজের পরিবর্তন দেখলেই থাইরয়েড কিংবা প্যারাথাইরয়েডের সমস্যা হয়েছে বলে ধরে নেওয়া ঠিক নয়।

 

একই উপসর্গের পেছনে অনেক ধরনের কারণ থাকতে পারে। তাই উপসর্গ দীর্ঘদিন থাকলে বা বারবার দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। প্রয়োজন হলে রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে আসল কারণ খুঁজে বের করা যায়।

 

বিশেষ করে ক্যালসিয়ামের মাত্রা অস্বাভাবিক হলে শুধু ক্যালসিয়ামের ওষুধ খাওয়া শুরু না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া ভালো। কারণ রক্তে ক্যালসিয়াম কম বা বেশি হওয়ার পেছনে প্যারাথাইরয়েডসহ একাধিক কারণ থাকতে পারে।

 

গলার একই এলাকায় পাশাপাশি অবস্থান করলেও থাইরয়েড আর প্যারাথাইরয়েড দুটি সম্পূর্ণ আলাদা গ্রন্থি। থাইরয়েড শরীরের বিপাকক্রিয়া ও শক্তি ব্যবহারের গতি নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। অন্যদিকে প্যারাথাইরয়েড রক্তে ক্যালসিয়ামের ভারসাম্য ঠিক রাখে।

 

তাই থাইরয়েডের সমস্যা আর প্যারাথাইরয়েডের সমস্যা এক জিনিস নয়। শুধু নামের মিল দেখে দুটিকে এক মনে করারও কারণ নেই।

 

শরীরে অস্বাভাবিক উপসর্গ দেখা দিলে নিজের মতো করে রোগ নির্ণয় না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই সবচেয়ে নিরাপদ। সঠিক পরীক্ষা করলেই বোঝা যায়, সমস্যাটি আসলে কোন গ্রন্থির সঙ্গে সম্পর্কিত।