

সন্তানকে সম্পদ নয়, সক্ষমতা দিন
লাবনী সিদ্দিকী ,ঢাকা ।
বাবা-মায়ের অর্থ থাকলেই সন্তানের জন্য জীবনের সব অর্জন কিনে দেওয়া যায় না। কিছু সাফল্য আছে, যা প্রত্যেক মানুষকে নিজের চেষ্টায় অর্জন করতে হয়। তাই সন্তানকে জীবনের বাস্তবতা শেখাতে হলে মাঝেমধ্যে তাকে নিজের দায়িত্ব নিজেকেই পালন করার সুযোগ দিতে হবে।
আমরা প্রায়ই একটি ভুল করি। সন্তানের যেন কোনো কষ্ট না হয়—এই ভালোবাসা থেকেই তার সব দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিই। কিন্তু অজান্তেই তাকে এমন এক পৃথিবীর জন্য অপ্রস্তুত করে ফেলি, যেখানে একসময় আমাদের আর পাশে থাকা সম্ভব হবে না। তখন জীবনই তাকে কঠিন শিক্ষা দেয়।
শৈশব থেকেই কিছু বিষয়ে সচেতন হওয়া জরুরি। যেমন—টাকা থাকলেই সব চাওয়া পূরণ করে দেওয়া, সব সময় নিজের সন্তানকেই সেরা ভাবা, সবকিছু তার জন্য কিনে দেওয়া, কিংবা তার সব কাজ করে দেওয়া। এসব আচরণ আপাতদৃষ্টিতে ভালোবাসার প্রকাশ হলেও, দীর্ঘমেয়াদে সন্তানের আত্মনির্ভরশীলতা, দায়িত্ববোধ ও ব্যক্তিত্ব গঠনে বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
শিশুর বিকাশে আমাদের সহযোগিতা অবশ্যই প্রয়োজন। কিন্তু তার ব্যক্তিত্ব, চরিত্র, সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা এবং আত্মসম্মান গড়ে ওঠার জন্য তাকে স্বাধীনভাবে শেখার সুযোগও দিতে হবে।
একটি বিষয় আমি গভীরভাবে বিশ্বাস করি—আমরা সারাজীবন যা কিছু অর্জন করি, তার সবই কেবল নিজের সন্তানের জন্য নয়; একটি সুন্দর সমাজ গড়ার জন্যও। কারণ সমাজ সুন্দর হলে পরিবারও নিরাপদ ও সুন্দর থাকে। আমাদের জীবনের অভিজ্ঞতা যেমন ছিল, আগামী প্রজন্মের পৃথিবী হয়তো তেমন থাকবে না। তাই তাদের এমনভাবে প্রস্তুত করতে হবে, যেন তারা পরিবর্তিত পৃথিবীতেও সৎ, সাহসী ও আত্মনির্ভর মানুষ হিসেবে দাঁড়াতে পারে।
আমরা অনেকেই অর্থ উপার্জন করতে জানি, কিন্তু অর্থ ব্যবস্থাপনা শেখাতে পারি না। অথচ অর্থের মূল্য বোঝা, সঞ্চয় করা, প্রয়োজন ও অপ্রয়োজনের পার্থক্য শেখা—এসবও জীবনের গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা।
আমার একজন অস্ট্রেলিয়ান চিকিৎসক বন্ধু প্রায়ই সন্তানের নৈতিক চরিত্র গঠন নিয়ে আমাকে মূল্যবান পরামর্শ দেন। আমি কৃতজ্ঞ আমার সেইসব বন্ধুদের প্রতি, যাদের উন্নত মানসিকতা আমাকে প্রতিনিয়ত একজন ভালো মানুষ এবং আরও সচেতন অভিভাবক হতে সাহায্য করে।
এবার বলি আমার মেয়ের গল্প
আমার মেয়ে মেহজাবিনের খুব গিটার শেখার ইচ্ছা। তার কণ্ঠও আলহামদুলিল্লাহ খুব সুন্দর। অনেক দিন ধরেই সে একটি গিটার চেয়ে আসছিল।
আমি তাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, “তুমি কি সত্যিই গিটার শিখতে চাও, নাকি শুধু নিজের কাছে একটি গিটার আছে—এই অনুভূতিটাই পেতে চাও?”
আমাদের বাসায় দুটি হারমোনিয়াম আছে। একটি আমার, আরেকটি মেহজাবিন তার প্রিয় ‘বুড়ি’ কাবেরী দত্তের কাছ থেকে উত্তরাধিকার হিসেবে পেয়েছে। সে শিশু একাডেমিতে সংগীতের প্রাথমিক প্রশিক্ষণও নিয়েছিল। স্কুলের শিক্ষার্থী হিসেবে বিটিভির কয়েকটি অনুষ্ঠানে অংশ নিয়েছে এবং ক্ষুদে শিল্পী হিসেবে সম্মানীও পেয়েছে। কিন্তু এরপর পড়াশোনা ও কোচিংয়ের ব্যস্ততায় সবই থেমে যায়।
একসময় আমি তার সব অতিরিক্ত কার্যক্রম বন্ধ করে দিই। অনেকেই প্রশ্ন করতে পারেন—কেন?
কারণ আমি বিশ্বাস করি, সহজে পাওয়া জিনিসের মূল্য আমরা অনেক সময় বুঝি না। আমার মেয়ে বুদ্ধিমতী। সে সেই শিক্ষা গ্রহণ করেছে। এখন প্রতিদিন স্কুল ও কোচিং শেষে নিয়মিত কারাতে অনুশীলনে যায়। খেলাধুলার প্রতি তার প্রবল আগ্রহ, মনে মনে সে ফুটবলার হওয়ারও স্বপ্ন দেখে। হয়তো সব স্বপ্ন বাস্তবায়নের সুযোগ সবার জীবনে আসে না, কিন্তু স্বপ্ন দেখার অধিকার সবার আছে।
কারাতে শেখার মাধ্যমে আমি তার মধ্যে আত্মবিশ্বাস, শৃঙ্খলা, সামাজিকতা এবং মানসিক দৃঢ়তা তৈরি হতে দেখছি। একজন শিশুর চরিত্র গঠনে খেলাধুলা ও মার্শাল আর্টের গুরুত্ব সত্যিই অপরিসীম।
এরপর আবার ফিরে আসি গিটারের কথায়।
আমি তাকে বলেছিলাম, “তোমাকে নিজের টাকাও জমাতে হবে। আমি মাঝেমধ্যে কিছু হাতখরচ দেব, তুমি সালামির টাকাও পাও। অপ্রয়োজনীয় খরচ কমিয়ে যদি সঞ্চয় করতে পারো, তাহলে তোমার পছন্দের সবচেয়ে ভালো গিটারটি তুমি পাবে।”
আমার লক্ষ্মী মেয়েটি সেই চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেছিল। সে অপ্রয়োজনীয় খরচ কমিয়েছে, টাকার মূল্য বুঝতে শিখেছে। নিজের জন্য অল্প খরচ করেছে, মাঝেমধ্যে বন্ধুদেরও আপ্যায়ন করেছে, আর বাকি অর্থ যত্ন করে সঞ্চয় করেছে।
আজ আমি সত্যিই আনন্দিত। কারণ সে শুধু একটি গিটার অর্জনের জন্য টাকা জমায়নি, বরং অর্থ ব্যবস্থাপনার একটি বড় শিক্ষা অর্জন করেছে।
আজ তার জন্মদিন
আজ আমার মেয়ের জন্মদিন ছিল। সারাদিন কাজের ব্যস্ততায় বড় কোনো আয়োজন করতে পারিনি। তবে মা হিসেবে তার পছন্দের কিছু খাবার রান্না করে অফিসে গিয়েছিলাম। ফেরার পথে গত এক বছরের পরিশ্রম, আত্মনিয়ন্ত্রণ ও সাফল্যের পুরস্কার হিসেবে তার বহুদিনের স্বপ্নের গিটারটি কিনে দিলাম।
পঞ্চম শ্রেণির বৃত্তি অর্জন, নিজের হাতখরচের টাকা সঞ্চয় করা এবং দায়িত্বশীল আচরণ—এই তিনটি অর্জনের স্বীকৃতিই ছিল সেই উপহার।
ছোটবেলায় আমার বাবাও আমাকে ঠিক এভাবেই অনুপ্রেরণা দিতেন। শুধু ভালো ফলাফলের জন্য নয়, ভালো অভ্যাস, দায়িত্ববোধ ও চরিত্রের জন্যও পুরস্কৃত করতেন। আজ আমি গর্বিত—এমন শিক্ষিত ও প্রজ্ঞাবান বাবা-মায়ের সন্তান হতে পেরে। তাদের কাছ থেকেই শিখেছি, একজন ভালো মানুষ তৈরি হয় ভালোবাসা, শৃঙ্খলা, মূল্যবোধ এবং ধৈর্যের সমন্বয়ে।
আজ আমি সেই শিক্ষাই আমার সন্তানের কাছে পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করছি।
আমার সন্তান এবং দেশের প্রতিটি শিশুই যেন সৎ, মানবিক, আত্মনির্ভর ও দায়িত্বশীল মানুষ হিসেবে বেড়ে ওঠে—এই কামনাই করি।
সবাই আমার পরিবারের জন্য দোয়া করবেন।
পুনশ্চ: মেহজাবিন তার সঞ্চিত অর্থের অর্ধেক নিজের প্রয়োজনের জন্য রেখেছে, আর বাকি অর্ধেক অসহায় মানুষের কল্যাণে দান করেছে। একজন মা হিসেবে এটাই আমার সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।
আপনার মতামত লিখুন :