ওজন কমাতে ফাইবার নাকি প্রোটিন বেশি জরুরি?


Saimoon Islam প্রকাশের সময় : অক্টোবর ৩০, ২০২৬, ২:৪৮ অপরাহ্ন / ১০০০
ওজন কমাতে ফাইবার নাকি প্রোটিন বেশি জরুরি?

 

 

 

ওজন কমানোর সময় খাবারের তালিকায় প্রোটিন বেশি রাখবেন নাকি ফাইবার—এ নিয়ে অনেকেই বেশ চিন্তিত থাকেন। কোনটিতে দীর্ঘক্ষণ পেট ভরা থাকবে, বারবার খাওয়ার প্রবণতা কমবে এই প্রশ্ন অনেকেরই। যারা শরীরের অতিরিক্ত চর্বি কমাতে চান এবং দীর্ঘক্ষণ পেট ভরা রাখতে চান, তাদের জন্য ফাইবার ও প্রোটিন দুটোই গুরুত্বপূর্ণ। তবে এই দুই পুষ্টি উপাদানের কাজ কিন্তু এক না। আপনার শরীরের জন্য দুটি উপাদান ভিন্ন ভিন্নভাবে সহায়তা করে থাকে।

 

 

প্রোটিন শরীরের পেশি গঠন ও ক্ষয় পূরণে সাহায্য করে। অন্যদিকে ফাইবার হজমশক্তি ভালো রাখে, কোষ্ঠকাঠিন্য কমায় ও দীর্ঘক্ষণ পেট ভরা রাখতে ভূমিকা রাখে। তাই ওজন কমানোর ক্ষেত্রে একটিকে বাদ দিয়ে অন্যটির ওপর নির্ভর করা ঠিক না। বরং প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় দুটিরই সঠিক সমন্বয় রাখা জরুরি।

 

ফাইবার কী এবং শরীরের জন্য কেন প্রয়োজন?

ফাইবার বা খাদ্যআঁশ হলো এক ধরনের জটিল কার্বোহাইড্রেট। এটি শরীরের পরিপাকতন্ত্রের জন্য খুবই প্রয়োজনীয় একটি উপাদান। এটি মূলত দুই ধরনের দ্রবণীয় ও অদ্রবণীয়।

 

দ্রবণীয় ফাইবার পানিতে মিশে জেলির মতো পদার্থ তৈরি করতে পারে। এটি হজমের গতি নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে। অন্যদিকে অদ্রবণীয় ফাইবার মলের পরিমাণ বাড়ায়। পাশাপাশি খাবার পরিপাকতন্ত্রের মধ্য দিয়ে চলাচলে সহায়তা করে।

 

ফাইবারের উপকারিতা

ফাইবারের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ উপকারিতা হলো-

 

দীর্ঘক্ষণ পেট ভরা রাখে: ফাইবারসমৃদ্ধ খাবার খেলে সহজে ক্ষুধা লাগে না। ফলে বারবার খাবার খাওয়ার প্রবণতা কমতে পারে।

 

হজম ভালো রাখে: নিয়মিত ফাইবার খেলে কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যা কমাতে সাহায্য করে।

 

রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে: বিশেষ করে দ্রবণীয় ফাইবার খাবার থেকে শর্করা শোষণের গতি ধীর করতে পারে।

 

 

ছবি: ইউটোপিয়ান ড্রিংকস

ছবি: ইউটোপিয়ান ড্রিংকস

 

হৃদযন্ত্র ভালো রাখে: কয়েক ধরনের ফাইবার আছে যেগুলো রক্তে খারাপ কোলেস্টেরল কমাতেও সাহায্য করে।

 

অন্ত্রের উপকারী ব্যাকটেরিয়ার খাবার হিসেবে কাজ করে: ফাইবার অন্ত্রের ভালো ব্যাকটেরিয়ার সংখ্যা ও কার্যক্রম বজায় রাখতে সহায়তা করে।

 

এ ছাড়া পর্যাপ্ত ফাইবার গ্রহণ টাইপ-২ ডায়াবেটিস, হৃদরোগ ও কোলোরেক্টাল ক্যানসারের ঝুঁকি কমানোর সঙ্গে সম্পর্কিত বলে বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে।

 

প্রোটিন কী এবং কেন প্রয়োজন?

প্রোটিন শরীরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টি উপাদান। এটি অ্যামিনো অ্যাসিড দিয়ে তৈরি। শরীর পেশি, বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গ এবং কোষের গঠন ও মেরামতের কাজে প্রোটিনকে ব্যবহার করে থাকে। পেশি গঠনের পাশাপাশি রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বজায় রাখা, শরীরের বৃদ্ধি ও বিভিন্ন বিপাকীয় কাজেও প্রোটিন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

 

প্রোটিনের উপকারিতা

প্রোটিনের কয়েকটি উপকারিতা হলো-

 

পেশি গঠন ও রক্ষণাবেক্ষণ: শরীরের পেশি তৈরি ও ক্ষয় হওয়া পেশি মেরামতে প্রোটিন জরুরি।

 

ওজন নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে: প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার খেলে দীর্ঘক্ষণ পেট ভরা মনে হয়। ফলে অতিরিক্ত খাবার খাওয়ার প্রবণতা কমে যায়।

 

পেশির ক্ষয় রোধ করে: ওজন কমাতে গেলে অনেক সময় শরীরের চর্বির পাশাপাশি পেশিও কমে যেতে পারে। পর্যাপ্ত প্রোটিন পেশির পরিমাণ ধরে রাখতে সাহায্য করে।

 

 

ছবি: কেয়ারিং ফার্মেসি

ছবি: কেয়ারিং ফার্মেসি

 

রোগ প্রতিরোধে ভূমিকা রাখে: শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থায় সহায়তা করে এরকম বিভিন্ন উপাদান তৈরিতে প্রোটিন প্রয়োজন।

 

ওজন কমাতে ফাইবার নাকি প্রোটিন কোনটি বেশি কার্যকরী?

ওজন কমানোর ক্ষেত্রে ফাইবার ও প্রোটিন দুটিই গুরুত্বপূর্ণ, তবে তাদের কাজের ধরন আলাদা। প্রোটিন খাবারের পর তৃপ্তি বাড়ায় ও পেশির পরিমাণ ধরে রাখতে সাহায্য করে। বিশেষ করে যারা নিয়মিত ব্যায়াম করেন বা ওজন কমানোর চেষ্টা করছেন, তাদের জন্য পর্যাপ্ত প্রোটিন গ্রহণ খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

 

অন্যদিকে ফাইবার পেট ভরা রাখতে এবং হজম প্রক্রিয়া স্বাভাবিক রাখতে সাহায্য করে। ফাইবারসমৃদ্ধ খাবার সাধারণত বেশি চিবাতে হয়। আবার, অনেক খাবারে ক্যালরির তুলনায় খাবারের পরিমাণও বেশি থাকে। ফলে তুলনামূলক কম ক্যালরি গ্রহণ করেও পেট ভরা রাখা সম্ভব হতে পারে।

 

তাই শুধু প্রোটিন বা শুধু ফাইবার খেয়ে ওজন কমানোর চেষ্টা না করে দুটিকে খাবার তালিকায় পাশাপাশি রাখা বেশি ভালো হবে। এর সঙ্গে মোট ক্যালরি গ্রহণ, নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম ও পর্যাপ্ত ঘুমও ওজন নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাাখে

 

কোন কোন খাবারে ফাইবার পাওয়া যায়?

প্রতিদিনের খাবার থেকেই সহজে ফাইবারের চাহিদা পূরণ করা সম্ভব। যেমন-

 

 

ছবি: আইস্টক

ছবি: আইস্টক

 

• ওটস

 

• ডাল

 

• ছোলা

 

• শিম ও বরবটি

 

• ব্রকলি

 

• গাজর

 

• আপেল

 

• নাশপাতি

 

• পেয়ারা

 

• বাদাম ও চিয়া সিড

 

• লাল চাল ও আটার রুটি

 

ফল খাওয়ার সময় সম্ভব হলে খোসাসহ খাওয়া ভালো। কারণ অনেক ফলে খোসার মধ্যেও ফাইবার থাকে।

 

প্রোটিনের ভালো উৎস কোনগুলো?

প্রোটিনের উৎস প্রাণিজ ও উদ্ভিজ্জ দুই ধরনের খাবার হতে পারে।

 

প্রাণিজ প্রোটিন:

 

• ডিম

 

• মাছ

 

• মুরগির মাংস

 

• দুধ

 

• টক দই

 

• পনির

 

 

ছবি: ওয়ান এমজি

ছবি: ওয়ান এমজি

 

উদ্ভিজ্জ প্রোটিন:

 

• ডাল

 

• ছোলা

 

• মটরশুঁটি

 

• সয়াবিন

 

• টোফু

 

• বাদাম

 

• বিভিন্ন ধরনের শস্য

 

আমাদের দেশে সহজলভ্য ডিম, মাছ, দুধ, ডাল ও ছোলা প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় রাখলে প্রয়োজনীয় প্রোটিনের চাহিদা পূরণ হতে পারে।

 

প্রতিদিন কতটুকু ফাইবার ও প্রোটিন খাওয়া জরুরি?

পুষ্টিবিদরা প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য প্রতিদিন প্রতি ১ হাজার ক্যালরি খাবারের বিপরীতে প্রায় ১৪ গ্রাম ফাইবার গ্রহণের পরামর্শ দিয়ে থাকেন। অর্থাৎ দৈনিক ২ হাজার ক্যালরি গ্রহণ করলে এর মধ্যে প্রায় ২৮ গ্রাম ফাইবার থাকা দরকার।

 

অন্যদিকে, সুস্থ প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য প্রোটিনের সাধারণ ন্যূনতম চাহিদা প্রতি কেজি শরীরের ওজনের বিপরীতে প্রায় ০.৮ গ্রাম। যেমন- কারও ওজন ৬০ কেজি হলে তার দৈনিক ন্যূনতম প্রোটিনের চাহিদা প্রায় ৪৮ গ্রাম।

 

প্রতিদিন ৬টি ডিমের সাদা অংশ খেলে কি ওজন কমানো যায়

জেনে নিন ওজন কমানোর ৩-২-১ নিয়ম

ওজন কমানোর ৮ সহজ অভ্যাস

তবে বয়স, শারীরিক পরিশ্রম, ব্যায়াম, শারীরিক অবস্থা ও ওজন কমানোর লক্ষ্যের ওপর নির্ভর করে এই চাহিদা পরিবর্তিত হতে পারে।

 

অতিরিক্ত ফাইবার বা প্রোটিন খেলে কি সমস্যা হতে পারে?

শরীরের প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত প্রোটিন গ্রহণ করা উচিত না। বিশেষ করে যদি আগে থেকে কিডনির সমস্যা থাকে, তাহলে স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হতে পারে। আবার, প্রাণিজ প্রোটিনের কিছু উৎসে স্যাচুরেটেড ফ্যাট বেশি থাকে, যা অতিরিক্ত গ্রহণ করলে হৃদস্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

 

অন্যদিকে, হঠাৎ করে অনেক বেশি ফাইবার খেলে গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা, পেট ফাঁপা ও অস্বস্তি হতে পারে। তাই ধীরে ধীরে ফাইবারের পরিমাণ বাড়াতে পারেন। এর সঙ্গে পর্যাপ্ত পানি পান করা জরুরি।

 

ওজন কমাতে ফাইবার আর প্রোটিনের মধ্যে একটি বেছে নিতে যাবেন না। দুটোই সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। প্রোটিন পেশি ধরে রাখতে ও ক্ষুধা নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে। অন্যদিকে, ফাইবার হজম ভালো রাখে, দীর্ঘক্ষণ পেট ভরা রাখে ও সামগ্রিক স্বাস্থ্যের উন্নতিতে ভূমিকা রাখে। সুষম খাদ্যাভ্যাস, পরিমিত খাবার, নিয়মিত ব্যায়াম আর পর্যাপ্ত ঘুমের মাধ্যমে ধীরে ধীরে স্বাস্থ্যকর উপায়ে ওজন কমানো উচিত। কোনো শারীরিক জটিলতা থাকলে অবশ্যই ডাক্তারের পরামর্শ নেবেন।