

হাতের আঙুলের চামড়া ওঠা আমাদের প্রায় সবারই একটি পরিচিত সমস্যা। অনেক সময় আঙুলের ডগা, নখের চারপাশে বা আঙুলের দুই পাশের চামড়া শুকিয়ে উঠে যেতে দেখা যায়। কারও ক্ষেত্রে চামড়া ওঠার পাশাপাশি চুলকানি, লালচে ভাব বা জ্বালাপোড়াও হয়। আবার কারও কোনো ব্যথা ছাড়াই চামড়া উঠতে থাকে।
সাধারণত ত্বকের শুষ্কতা, সাবান বা ডিটারজেন্টের অতিরিক্ত ব্যবহার অথবা কোনো কিছুর সংস্পর্শে ত্বকে অ্যালার্জি হওয়ার কারণে এমনটা হতে পারে। তবে কখনো কখনো একজিমা, ছত্রাকের সংক্রমণ বা ত্বকের অন্য কোনো সমস্যার কারণেও আঙুলের চামড়া উঠতে পারে। তাই সমস্যাটি বারবার হলে বা দীর্ঘদিন স্থায়ী হলে এর কারণ খুঁজে বের করা জরুরি।
আঙুলের চামড়া ওঠার কারণ কী?
আঙুলের চামড়া ওঠার পেছনে বেশ কয়েকটি কারণ থাকতে পারে। নিচে সাধারণ কারণগুলো তুলে ধরা হলো-
ত্বক শুষ্ক হয়ে যাওয়া
আঙুলের চামড়া ওঠার অন্যতম সাধারণ কারণ হলো ত্বকের শুষ্কতা। ত্বক থেকে প্রয়োজনীয় আর্দ্রতা ও প্রাকৃতিক তেল কমে গেলে চামড়া রুক্ষ হয়ে যায়। ফলে চামড়ায় ফাটল দেখা দিতে পারে এবং ওপরের স্তর উঠে যেতে পারে।
শীতকালে, শুষ্ক আবহাওয়ায় বা বারবার হাত ধোয়ার অভ্যাস থাকলে এই সমস্যা বেশি দেখা দিতে পারে। অতিরিক্ত গরম পানি দিয়ে হাত ধোয়া এবং ময়েশ্চারাইজার ব্যবহার না করলেও ত্বক শুষ্ক হতে পারে।
সাবান, স্যানিটাইজার ও ডিটারজেন্টের ব্যবহার
প্রতিদিন বিভিন্ন ধরনের সাবান, হ্যান্ডওয়াশ, স্যানিটাইজার ও বাসন ধোয়ার ডিটারজেন্ট ব্যবহার করতে হয়। এসব পণ্যের কিছু উপাদান ত্বকের প্রাকৃতিক সুরক্ষাব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
বিশেষ করে দীর্ঘ সময় ধরে ডিটারজেন্ট বা পরিষ্কার করার রাসায়নিকের সংস্পর্শে থাকলে আঙুলের চামড়া শুষ্ক হয়ে উঠতে পারে। এ ক্ষেত্রে ত্বকে জ্বালাপোড়া, লালচে ভাব ও চুলকানিও দেখা দিতে পারে।
একজিমা এমন একটি ত্বকের সমস্যা, যার কারণে ত্বক শুষ্ক, লালচে ও চুলকানিযুক্ত হয়ে পড়ে। হাতের একজিমা হলে আঙুলের চামড়া উঠতে পারে, ত্বকে ফাটল দেখা দিতে পারে এবং কখনো কখনো ছোট ছোট ফোসকাও হতে পারে।
যাদের হাত দিয়ে নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজ করতে হয় বা যারা রাসায়নিক পদার্থের সংস্পর্শে থাকেন, তাদের এ ধরনের সমস্যা হওয়ার ঝুঁকি বেশি থাকতে পারে। একজিমার চিকিৎসা নির্ভর করে এর ধরন ও তীব্রতার ওপর।
অ্যালার্জি
কোনো সাবান, প্রসাধনী, ধাতু, সুগন্ধিযুক্ত পণ্য বা রাসায়নিক পদার্থের সংস্পর্শে এলে কারও কারও ত্বকে অ্যালার্জির প্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে। একে কন্টাক্ট ডার্মাটাইটিস বলা হয়।
এ ক্ষেত্রে আঙুলের ত্বকে চুলকানি, ফোলাভাব, লালচে দাগ বা ছোট ফোসকা হতে পারে। পরে আক্রান্ত স্থানের চামড়া উঠতে পারে। নতুন কোনো পণ্য ব্যবহারের পর সমস্যা শুরু হলে সেটির সঙ্গে ত্বকের প্রতিক্রিয়ার সম্পর্ক আছে কি না, তা খেয়াল করা দরকার।
ছত্রাকের সংক্রমণ
আঙুলের চামড়া ওঠার আরেকটি সম্ভাব্য কারণ হলো ছত্রাকের সংক্রমণ। এতে ত্বকে চুলকানি, খসখসে ভাব, লালচে দাগ এবং চামড়া ওঠার মতো লক্ষণ দেখা দিতে পারে। আঙুলের ফাঁকেও সমস্যা হতে পারে।
তবে শুধু চামড়া উঠছে বলেই সেটিকে ছত্রাকের সংক্রমণ ধরে নেওয়া ঠিক না। কারণ একজিমা ও অন্যান্য ত্বকের সমস্যাতেও একই ধরনের লক্ষণ দেখা দিতে পারে। তাই প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে সঠিক চিকিৎসা শুরু করা উচিত।
অতিরিক্ত ঘাম ও আঙুলে ছোট ফোসকা
কিছু মানুষের আঙুলের পাশে বা তালুতে ছোট ছোট পানিভর্তি ফোসকা হয়। এর সঙ্গে তীব্র চুলকানি থাকতে পারে। পরে ফোসকাগুলো শুকিয়ে গেলে বা ফেটে গেলে ত্বকের ওপরের স্তর উঠে যেতে পারে।
এটি ডিশাইড্রোটিক একজিমা নামের এক ধরনের ত্বকের সমস্যা হতে পারে। গরম আবহাওয়া, ঘাম, কিছু অ্যালার্জি এবং অন্যান্য কারণের সঙ্গে এর সম্পর্ক থাকতে পারে। এমন লক্ষণ দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই ভালো।
সোরিয়াসিস একটি দীর্ঘস্থায়ী ত্বকের রোগ, যাতে ত্বকের কোষ স্বাভাবিকের তুলনায় দ্রুত তৈরি হয়। ফলে ত্বকে মোটা, খসখসে ও আঁশযুক্ত দাগ দেখা দিতে পারে। হাত ও আঙুলেও এর প্রভাব পড়তে পারে।
এ ছাড়া কিছু সংক্রমণ, ওষুধের প্রতিক্রিয়া এবং বিরল কিছু ত্বকের রোগের কারণেও চামড়া উঠতে পারে। তাই সমস্যাটি দীর্ঘস্থায়ী হলে বা অন্য উপসর্গ দেখা দিলে চিকিৎসকের সাহায্য নেওয়া জরুরি।
আঙুলের চামড়া উঠলে কী করবেন?
আঙুলের চামড়া ওঠার কারণ সাধারণ হলে কিছু সাধারণ যত্নে উপকার পাওয়া যেতে পারে। তবে ত্বকের রোগ বা সংক্রমণ থাকলে আলাদা চিকিৎসার প্রয়োজন হতে পারে।
নিয়মিত ময়েশ্চারাইজার ব্যবহার করুন: হাত ধোয়ার পর এবং ত্বক শুষ্ক মনে হলে সুগন্ধিবিহীন ময়েশ্চারাইজিং ক্রিম বা মলম লাগান। পেট্রোলিয়াম জেলিও শুষ্ক ত্বকের আর্দ্রতা ধরে রাখতে সাহায্য করতে পারে।
মৃদু সাবান ব্যবহার করুন: অতিরিক্ত সুগন্ধি বা ত্বকে জ্বালা সৃষ্টি করতে পারে এমন সাবান এড়িয়ে চলুন। হাত ধোয়ার সময় খুব গরম পানির পরিবর্তে কুসুম গরম বা স্বাভাবিক তাপমাত্রার পানি ব্যবহার করুন।
ডিটারজেন্ট ব্যবহারের সময় গ্লাভস পরুন: বাসন ধোয়া, ঘর পরিষ্কার করা কিংবা রাসায়নিক পদার্থ নিয়ে কাজ করার সময় উপযুক্ত সুরক্ষামূলক গ্লাভস ব্যবহার করুন। গ্লাভসের কারণে ত্বকে ঘাম বা জ্বালা হলে সেটিও খেয়াল রাখুন।
চামড়া টেনে তুলবেন না: আঙুলের চামড়া উঠে গেলে অনেকে সেটি হাত দিয়ে টেনে ছিঁড়ে ফেলেন। এতে ত্বকে ক্ষত তৈরি হতে পারে এবং জীবাণু প্রবেশ করে সংক্রমণ ঘটাতে পারে। তাই চামড়াকে স্বাভাবিকভাবে উঠতে দিন।
ত্বক ঘষাঘষি করবেন না: চামড়া ওঠা স্থানে স্ক্রাব, শক্ত ব্রাশ বা অন্য কোনো ঘষামাজা করার উপকরণ ব্যবহার করবেন না। এতে ত্বকের ক্ষতি আরও বাড়তে পারে।
সমস্যা সৃষ্টিকারী পণ্য এড়িয়ে চলুন: কোনো নির্দিষ্ট সাবান, স্যানিটাইজার বা পরিষ্কার করার পণ্য ব্যবহারের পর সমস্যা বাড়লে সেটির ব্যবহার সীমিত করুন এবং বিকল্প পণ্য বেছে নিন।
শুষ্ক ত্বকের যত্নে এসব অভ্যাস সাহায্য করতে পারে। তবে সংক্রমণ বা একজিমার মতো সমস্যা থাকলে শুধু ময়েশ্চারাইজার ব্যবহার করলেই সব সময় উপকার পাওয়া যায় না।
কখন চিকিৎসকের পরামর্শ নেবেন?
আঙুলের চামড়া ওঠা সব সময় গুরুতর সমস্যার লক্ষণ নয়। তবে নিচের লক্ষণগুলো দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
দীর্ঘদিন ধরে চামড়া উঠতে থাকলে বা বারবার একই সমস্যা হলে।
আঙুলে তীব্র চুলকানি, ব্যথা, লালচে ভাব বা ফোলাভাব দেখা দিলে।
ত্বকে গভীর ফাটল তৈরি হলে, রক্ত পড়লে বা পুঁজ বের হলে।
ছোট ছোট ফোসকা দেখা দিলে বা সমস্যাটি হাতের অন্য অংশেও ছড়িয়ে পড়লে।
সাধারণ যত্ন নেওয়ার পরও অবস্থার উন্নতি না হলে।
জ্বর, কাঁপুনি বা সংক্রমণের অন্যান্য লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা নিন। চিকিৎসক ত্বক পরীক্ষা করে প্রয়োজনে উপযুক্ত পরীক্ষা ও চিকিৎসার পরামর্শ দিতে পারেন।
আঙুলের চামড়া ওঠা কি ভিটামিনের অভাবে হয়?
অনেকেই মনে করেন, আঙুলের চামড়া উঠলেই শরীরে ভিটামিনের অভাব রয়েছে। কিন্তু শুধু এই লক্ষণ দেখে ভিটামিনের ঘাটতি নির্ণয় করা যায় না। ত্বকের শুষ্কতা, একজিমা, অ্যালার্জি ও সংক্রমণসহ বিভিন্ন কারণে এমন হতে পারে।
তাই চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ভিটামিন বা অন্য কোনো সাপ্লিমেন্ট খাওয়া শুরু করা উচিত না। পুষ্টির ঘাটতির সন্দেহ থাকলে চিকিৎসক উপসর্গ ও প্রয়োজনীয় পরীক্ষার ভিত্তিতে পরবর্তী পদক্ষেপ নির্ধারণ করতে পারেন।
আঙুলের চামড়া ওঠার পেছনে সাধারণ শুষ্কতা থেকে শুরু করে একজিমা, অ্যালার্জি ও সংক্রমণের মতো বিভিন্ন কারণ থাকতে পারে। নিয়মিত ময়েশ্চারাইজার ব্যবহার, মৃদু সাবান দিয়ে হাত ধোয়া এবং ক্ষতিকর রাসায়নিকের সংস্পর্শ এড়িয়ে চলার মাধ্যমে অনেক ক্ষেত্রে সমস্যাটি কমানো সম্ভব।
তবে চামড়া ওঠার সঙ্গে ব্যথা, ফোসকা, ফোলাভাব বা সংক্রমণের লক্ষণ থাকলে অবহেলা করবেন না। সমস্যাটি বারবার হলে কিংবা দীর্ঘদিনেও না সারলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। সঠিক কারণ জানা গেলে উপযুক্ত চিকিৎসা নেওয়া সহজ হয়।
আপনার মতামত লিখুন :