

শরীরে ভিটামিন ডি কমে গেলে যে ৮ লক্ষণ দেখা দিতে পারে
সারাক্ষণ ক্লান্ত লাগছে, হাড় বা শরীরের বিভিন্ন অংশে ব্যথা হচ্ছে কিংবা পেশিতে দুর্বলতা অনুভব করছেন? এসব সমস্যার পেছনে নানা কারণ থাকতে পারে। এর মধ্যে ভিটামিন ডি-এর ঘাটতিও একটি সম্ভাব্য কারণ। বিশেষ করে দিনের বেশির ভাগ সময় ঘরের ভেতরে কাটানো, সূর্যের আলো কম পাওয়া এবং খাদ্যতালিকায় ভিটামিন ডি-এর উৎস কম থাকলে এই ঘাটতির ঝুঁকি বাড়তে পারে।
ভিটামিন ডি শরীরে ক্যালসিয়াম শোষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ফলে হাড় ও দাঁতের স্বাভাবিক গঠন ও শক্তি ধরে রাখতে এটি প্রয়োজন। পেশি, স্নায়ু এবং রোগ প্রতিরোধব্যবস্থার স্বাভাবিক কাজেও ভিটামিন ডি ভূমিকা রাখে।
তবে শরীরে ভিটামিন ডি কমে গেলেই সব ক্ষেত্রে একই ধরনের উপসর্গ দেখা যাবে, এমন নয়। অনেক সময় ঘাটতি থাকলেও স্পষ্ট কোনো লক্ষণ থাকে না। তাই শুধু উপসর্গ দেখে নিশ্চিত হওয়ার বদলে প্রয়োজন হলে রক্ত পরীক্ষা ও চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।
ভিটামিন ডি-এর ঘাটতির ৮টি সম্ভাব্য লক্ষণ
হাড়ে বা শরীরে ব্যথা: দীর্ঘদিন ভিটামিন ডি-এর ঘাটতি থাকলে হাড়ের স্বাভাবিক গঠন ও খনিজায়ন ব্যাহত হতে পারে। প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে গুরুতর ঘাটতি অস্টিওম্যালেশিয়া বা হাড় নরম হয়ে যাওয়ার সমস্যার সঙ্গে সম্পর্কিত, যার অন্যতম লক্ষণ হাড়ে ব্যথা।
তবে শরীর বা কোমর ব্যথা হলেই যে ভিটামিন ডি কমেছে, তা ধরে নেওয়া ঠিক নয়। এ ধরনের ব্যথার আরও অনেক কারণ থাকতে পারে।
অস্বাভাবিক ক্লান্তি ও দুর্বলতা: ভিটামিন ডি-এর ঘাটতির সঙ্গে ক্লান্তি ও দুর্বলতার সম্পর্ক পাওয়া গেছে। পর্যাপ্ত ঘুমের পরও যদি দীর্ঘদিন শরীর দুর্বল লাগে বা স্বাভাবিক কাজ করতেই বেশি ক্লান্তি হয়, তাহলে চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলা যেতে পারে। তবে ক্লান্তির কারণ হিসেবে রক্তস্বল্পতা, ঘুমের সমস্যা, থাইরয়েডের সমস্যা, মানসিক চাপসহ আরও অনেক বিষয় থাকতে পারে।
পেশির দুর্বলতা: ভিটামিন ডি পেশির স্বাভাবিক কাজের জন্যও প্রয়োজন। গুরুতর ঘাটতিতে পেশির দুর্বলতা দেখা দিতে পারে। বিশেষ করে বয়স্কদের ক্ষেত্রে পেশির শক্তি কমে যাওয়া ও পড়ে যাওয়ার ঝুঁকির সঙ্গে ভিটামিন ডি-এর ঘাটতির সম্পর্ক রয়েছে।
শিশুদের হাড়ের সমস্যা: শিশুদের জন্য ভিটামিন ডি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘদিন ঘাটতি থাকলে রিকেটস হতে পারে। এতে হাড় নরম ও দুর্বল হয়ে যায় এবং হাড়ের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত হতে পারে।
সহজে হাড় ভেঙে যাওয়া: ভিটামিন ডি ক্যালসিয়াম শোষণে সাহায্য করে এবং হাড়ের স্বাস্থ্য বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘদিনের ঘাটতি হাড়ের দুর্বলতার সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। বিশেষ করে বয়স বাড়ার সঙ্গে হাড়ের স্বাস্থ্য নিয়ে সমস্যা থাকলে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন।
বারবার অসুস্থ হওয়ার প্রবণতা: রোগ প্রতিরোধব্যবস্থার স্বাভাবিক কাজেও ভিটামিন ডি ভূমিকা রাখে। তবে ঘন ঘন সর্দি-কাশি বা সংক্রমণ হলেই ভিটামিন ডি-এর ঘাটতি রয়েছে, এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় না। এ বিষয়ে গবেষণা থাকলেও উপসর্গটি একা ভিটামিন ডি ঘাটতির নির্দিষ্ট লক্ষণ নয়।
মেজাজ খারাপ বা অবসাদ: ভিটামিন ডি-এর মাত্রা এবং বিষণ্নতার মধ্যে সম্পর্ক নিয়ে গবেষণা হয়েছে। তবে ভিটামিন ডি কম থাকলেই যে বিষণ্নতা হবে, এমন সরাসরি কারণ-ফল সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত নয়। তাই দীর্ঘদিন মন খারাপ, আগ্রহ কমে যাওয়া বা অবসাদের মতো সমস্যা থাকলে শুধু ভিটামিন ডি-এর ওপর নির্ভর না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
পেশিতে টান বা খিঁচুনি: ভিটামিন ডি শরীরে ক্যালসিয়াম ও ফসফেটের ভারসাম্য বজায় রাখতে ভূমিকা রাখে। গুরুতর ঘাটতির ক্ষেত্রে পেশিতে খিঁচুনি বা টানসহ বিভিন্ন সমস্যা দেখা দিতে পারে।
ভিটামিন ‘ডি’ কমেছে বুঝবেন কীভাবে, পরীক্ষা ছাড়া সাপ্লিমেন্ট কতটা নিরাপদ
কেন ভিটামিন ডি কমে যেতে পারে?
শরীরে ভিটামিন ডি কমে যাওয়ার অন্যতম কারণ হলো পর্যাপ্ত সূর্যের আলো না পাওয়া। ত্বকে সূর্যের অতিবেগুনি বি রশ্মি পড়লে শরীর নিজেই ভিটামিন ডি তৈরি করতে পারে। তবে বয়স, ত্বকের ধরন, পোশাক, ভৌগোলিক অবস্থান, ঋতু এবং সূর্যালোক পাওয়ার পরিমাণসহ বিভিন্ন বিষয় এতে প্রভাব ফেলে।
যারা খুব কম বাইরে বের হন, শরীরের বেশির ভাগ অংশ সবসময় ঢেকে রাখেন, বয়স্ক ব্যক্তি, স্থূলতা রয়েছে এমন মানুষ এবং কিছু ধরনের হজম বা শোষণজনিত সমস্যায় ভোগা ব্যক্তিদের ভিটামিন ডি ঘাটতির ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি হতে পারে।
রোদে দাঁড়ালেই কি ভিটামিন ডি-এর ঘাটতি পূরণ হবে?
ভিটামিন ডি তৈরির গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক উৎস হলো সূর্যের আলো। তবে সবার জন্য সকাল ৮টা থেকে ১১টা পর্যন্ত নির্দিষ্ট ১৫ থেকে ৩০ মিনিট রোদে দাঁড়ানোর মতো একটি সার্বজনীন নিয়ম নেই। কতক্ষণ সূর্যের আলো প্রয়োজন তা ব্যক্তিভেদে এবং পরিবেশভেদে পরিবর্তিত হয়।
এ ছাড়া অতিরিক্ত অতিবেগুনি রশ্মির সংস্পর্শে ত্বকের ক্ষতির ঝুঁকি রয়েছে। তাই ভিটামিন ডি পাওয়ার জন্য ইচ্ছাকৃতভাবে দীর্ঘ সময় রোদে পুড়ে থাকা ঠিক নয়।
খাবার থেকে কীভাবে ভিটামিন ডি পাবেন?
খাবারে প্রাকৃতিকভাবে ভিটামিন ডি-এর উৎস খুব বেশি নয়। চর্বিযুক্ত মাছ, ডিমের কুসুম এবং কিছু মাশরুমে ভিটামিন ডি পাওয়া যায়। এ ছাড়া ভিটামিন ডি যুক্ত বা ফোর্টিফায়েড দুধ ও কিছু খাদ্যপণ্য থেকেও এটি পাওয়া সম্ভব।
তাই নিয়মিত খাদ্যতালিকায় মাছ, ডিমসহ পুষ্টিকর খাবার রাখা উপকারী। তবে শুধু খাবার দিয়ে গুরুতর ভিটামিন ডি ঘাটতি পূরণ করা সব সময় সম্ভব নাও হতে পারে।
কতটা ভিটামিন ডি প্রয়োজন?
যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউটস অব হেলথের তথ্য অনুযায়ী, ১৯ থেকে ৭০ বছর বয়সী প্রাপ্তবয়স্কদের প্রতিদিন ৬০০ আইইউ বা ১৫ মাইক্রোগ্রাম ভিটামিন ডি প্রয়োজন। ৭১ বছর বা তার বেশি বয়সে প্রয়োজন ৮০০ আইইউ বা ২০ মাইক্রোগ্রাম।
তবে ব্যক্তির বয়স, শারীরিক অবস্থা এবং ভিটামিন ডি-এর রক্তের মাত্রার ওপর ভিত্তি করে চিকিৎসক আলাদা মাত্রা নির্ধারণ করতে পারেন।
ঘাটতি থাকলে কি সাপ্লিমেন্ট খেতে হবে?
প্রয়োজনে চিকিৎসক ভিটামিন ডি সাপ্লিমেন্ট দিতে পারেন। কিন্তু রক্ত পরীক্ষায় ঘাটতি ধরা পড়লেই নিজের ইচ্ছায় উচ্চমাত্রার ভিটামিন ডি ক্যাপসুল বা স্যাশে খাওয়া উচিত নয়।
ভিটামিন ডি অতিরিক্ত গ্রহণ করলেও শরীরে সমস্যা হতে পারে। অতিরিক্ত ভিটামিন ডি রক্তে ক্যালসিয়ামের মাত্রা বাড়িয়ে বমি বমি ভাব, বমি, দুর্বলতা, অতিরিক্ত তৃষ্ণা ও প্রস্রাব, পানিশূন্যতা এবং কিডনিতে পাথরের মতো সমস্যা তৈরি করতে পারে। গুরুতর ক্ষেত্রে কিডনি বিকল হওয়া বা হৃদ্স্পন্দনে অস্বাভাবিকতাও দেখা দিতে পারে।
তাই ৬০০০ বা ৬০,০০০ আইইউ-এর মতো উচ্চমাত্রার ডোজ সবার জন্য উপযুক্ত নয়। নির্দিষ্ট ঘাটতি বা চিকিৎসাজনিত প্রয়োজন থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ডোজ ও সময়কাল ঠিক করতে হবে।
ভিটামিন ডি পরীক্ষা কীভাবে করা হয়?
শরীরে ভিটামিন ডি-এর মাত্রা জানতে সাধারণত রক্তে ২৫-হাইড্রক্সিভিটামিন ডি বা 25(OH)D পরীক্ষা করা হয়। NIH-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০ ng/mL বা তার বেশি মাত্রা বেশির ভাগ মানুষের জন্য পর্যাপ্ত হিসেবে বিবেচিত হয়, আর ১২ ng/mL-এর নিচের মাত্রা ঘাটতির সঙ্গে সম্পর্কিত। তবে পরীক্ষার ফল ব্যক্তির সামগ্রিক স্বাস্থ্য ও চিকিৎসাগত পরিস্থিতির সঙ্গে মিলিয়ে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।
ভিটামিন ডি শুধু হাড়ের জন্য নয়, শরীরের আরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কাজের সঙ্গে যুক্ত। পর্যাপ্ত সূর্যের আলো, পুষ্টিকর খাবার এবং প্রয়োজন হলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী সাপ্লিমেন্ট গ্রহণের মাধ্যমে ঘাটতি মোকাবিলা করা যায়।
তবে ক্লান্তি, শরীর ব্যথা, পেশির দুর্বলতা বা চুল পড়ার মতো সাধারণ কোনো উপসর্গ দেখেই ভিটামিন ডি-এর ঘাটতি ধরে নেওয়া ঠিক নয়। দীর্ঘদিন সমস্যা থাকলে কারণ নির্ণয়ের জন্য চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া এবং প্রয়োজন অনুযায়ী রক্ত পরীক্ষা করাই সবচেয়ে ভালো উপায়।
আপনার মতামত লিখুন :