

নারায়ণগঞ্জ শহরে যানজট নিরসনে নিবন্ধনহীন ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার বিরুদ্ধে অভিযান এবং ট্রাফিক স্বেচ্ছাসেবক নিয়োগের পর বদলাতে শুরু করেছে সড়কের চিত্র। দিনের বেলায় আগের মতো দীর্ঘ যানবাহনের সারি কিংবা ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজটে আটকে থাকার পরিস্থিতি অনেকটাই কমেছে। তবে যানজট কমার স্বস্তির বিপরীতে নগরবাসীর জন্য নতুন ভোগান্তি হয়ে দাঁড়িয়েছে মিশুকের বাড়তি ভাড়া, সড়কে হকারদের অবস্থান এবং নির্দিষ্ট কিছু পয়েন্টে যানবাহনের বিশৃঙ্খল পার্কিং।
গত ৪ অক্টোবর থেকে অগ্রিম ঘোষণা দিয়ে নিবন্ধনহীন ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন (নাসিক)। পরদিন ৫ অক্টোবর চাষাঢ়া জিরো পয়েন্ট এলাকায় ট্রাফিক পুলিশের সহযোগিতায় যানজট নিরসন ও সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে ২২ জন ট্রাফিক স্বেচ্ছাসেবক নিয়োগ দেওয়া হয়। বিকেএমইএ, নারায়ণগঞ্জ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি ও মডেল গ্রুপের পক্ষ থেকে তাঁদের নিয়োগ দেওয়া হয়। এদিন স্থানীয় সংসদ সদস্য, প্রশাসনের কর্মকর্তা, ব্যবসায়ী এবং রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনের নেতারা উপস্থিত ছিলেন। এরপর থেকেই শহরের সড়কে পরিবর্তন দৃশ্যমান হতে শুরু করে।
৬ অক্টোবর থেকে চাষাঢ়াসহ শহরের গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে নিবন্ধনহীন রিকশা, ভ্যান ও মিশুকের বিরুদ্ধে নাসিকের অভিযান আরও জোরদার করা হয়। মেট্রো হল মোড়, চাঁদমারি, ডাকবাংলো, গলাচিপা মোড়, ২ নম্বর রেলগেট ও মণ্ডলপাড়া ব্রিজ এলাকায় নাসিকের ৩০ জন আনসার সদস্য এবং অর্ধশতাধিক যানজট নিরসনকর্মীকে দায়িত্ব পালন করতে দেখা যায়। তাঁরা নিবন্ধনবিহীন যানবাহন ফিরিয়ে দেওয়ার পাশাপাশি সড়কে শৃঙ্খলা বজায় রাখার চেষ্টা করছেন।
অন্যদিকে, বাগে জান্নাত, ডাকবাংলো, সোনালী ব্যাংকের মোড় ও সলিমুল্লাহ সড়কে দিনের দুই পালায় ১১ জন করে ট্রাফিক স্বেচ্ছাসেবক দায়িত্ব পালন করছেন।
নাসিকের অভিযান ও স্বেচ্ছাসেবকদের তৎপরতায় শহরে নিবন্ধনহীন মিশুক, রিকশা ও ভ্যানের চলাচল কমেছে। একই সঙ্গে বড় আকারের ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা শহরের ভেতরে প্রবেশ করতে না পারায় যানজটের চাপও কমেছে। ফলে দিনের বেলায় চাষাঢ়াসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়কে আগের মতো দীর্ঘ যানবাহনের সারি দেখা যাচ্ছে না। তবে সন্ধ্যার পর যানজট কিছুটা বাড়ছে।
ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় এই পরিবর্তনের মধ্যেও কিছু এলাকায় ভোগান্তি রয়ে গেছে। দিনের বেলায় শহীদ মিনারের সামনের সড়ক ও সোনালী ব্যাংকের মোড়ে হকারদের অবস্থানের কারণে পথচারীদের বাধ্য হয়ে সড়ক দিয়ে চলাচল করতে হচ্ছে। এর সঙ্গে সিএনজিচালিত অটোরিকশাসহ বিভিন্ন যানবাহনের যত্রতত্র পার্কিং পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
গত কয়েক দিনে পোশাক কারখানার শ্রমিকদের সড়ক অবরোধের কারণেও নগরবাসীকে দীর্ঘ সময় যানজটে আটকে থাকতে হয়েছে। এ ছাড়া ১ ও ২ নম্বর রেলগেটে ট্রেন চলাচলের সময় যানজট তৈরি হচ্ছে। অন্যদিকে, সিরাজউদ্দৌলা সড়কে ট্রাফিক স্বেচ্ছাসেবক না থাকা এবং সড়কে হকারদের অবস্থানের কারণে দিনের অধিকাংশ সময়ই যানজটে পড়তে হচ্ছে যাত্রীদের। ব্যাহত হচ্ছে পথচারীদের স্বাভাবিক চলাচলও।
চেম্বারের পরিচালক, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন উই আর ভলান্টিয়ারের সভাপতি ও ট্রাফিক স্বেচ্ছাসেবকদের সমন্বয়কারী আহমেদুর রহমান তনু প্রেস নারায়ণগঞ্জকে বলেন, “প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি, ব্যবসায়ীসহ সব স্টেকহোল্ডার সম্মিলিতভাবে কাজ করলে যেকোনো সংকট মোকাবিলা করা সম্ভব। চাষাঢ়া জিরো পয়েন্ট তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ। সবার ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় এখানে এখন আর আগের মতো চিরচেনা যানজট নেই।”
তিনি বলেন, “এই শহর আমাদের সবার। নারায়ণগঞ্জকে সুন্দর, নিয়ম ও শৃঙ্খলার মধ্যে নিয়ে আসার যে স্বপ্ন আমরা দেখি, তা সবার ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টায় সম্ভব।” এ উদ্যোগে সবাইকে একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি।
যানজট কমলেও বাড়তি ভাড়ার চাপ
সড়কে যানজট কমে আসায় নগরবাসীর মধ্যে স্বস্তি ফিরলেও নতুন করে ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে গণপরিবহনের বাড়তি ভাড়া। আগে চাষাঢ়া ও ১ নম্বর রেলগেট এলাকায় বড় অটোরিকশায় যাত্রীরা সহজে যাতায়াত করতে পারতেন। এখন এসব যানবাহনের চলাচল সীমিত হওয়ায় অনেককে তিন আসনের বৈধ মিশুকে যাতায়াত করতে হচ্ছে। এতে গন্তব্যে পৌঁছাতে বাড়তি ভাড়া গুনতে হচ্ছে তাঁদের।
মিশুকের ভাড়া নিয়ে চালক ও যাত্রীদের মধ্যে বাগ্বিতণ্ডাও বেড়েছে। কয়েকজন চালক বাড়তি ভাড়া না নিয়ে চাষাঢ়া থেকে যাত্রীদের মেট্রো হল মোড়ে নামিয়ে দিচ্ছেন। এ ক্ষেত্রে জনপ্রতি ১০ টাকা ভাড়া নেওয়া হচ্ছে। এরপর গন্তব্যে যেতে যাত্রীদের অন্য অটোরিকশায় উঠতে হচ্ছে। এতে একদিকে বাড়তি ভাড়া দিতে হচ্ছে, অন্যদিকে পোহাতে হচ্ছে বাড়তি ভোগান্তি।
এ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন এক বয়স্ক দম্পতিও। তাঁদের মতো অনেক যাত্রীর অভিযোগ, যানজট কমায় স্বস্তি মিললেও বাড়তি ভাড়ার কারণে দৈনন্দিন যাতায়াতের খরচ বেড়েছে। আগে চাষাঢ়া, কালীরবাজার ও ১ নম্বর রেলগেট এলাকা থেকে নবীগঞ্জ ঘাটে ১০ টাকায় যাওয়া যেত। এখন একই পথে যেতে প্রায় দ্বিগুণ ভাড়া গুনতে হচ্ছে বলে জানিয়েছেন যাত্রীরা।
চার মাস ধরে ভাড়ায় মিশুক চালান মো. আরিফ। তিনি প্রেস নারায়ণগঞ্জকে বলেন, “লাইসেন্সের জন্য ৮০ থেকে ১০০ টাকা এবং মালিককে ৫০০ টাকা জমা দিতে হয়। সব মিলিয়ে প্রতিদিন প্রায় ৬০০ টাকা খরচ হয়ে যায়। তাই বাধ্য হয়েই আমাদের বেশি ভাড়া নিতে হচ্ছে।”
চালকদের দাবি, ডিজিটাল নম্বরপ্লেটের খরচ, গ্যারেজ ভাড়া ও অন্যান্য ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় তাঁদের ওপর আর্থিক চাপ তৈরি হয়েছে। সেই চাপ সামাল দিতে গিয়ে যাত্রীদের কাছ থেকে বাড়তি ভাড়া নিতে হচ্ছে।
সব মিলিয়ে নারায়ণগঞ্জ শহরে যানজট নিরসনে নাসিকের অভিযান ও ট্রাফিক স্বেচ্ছাসেবকদের তৎপরতা ইতিবাচক পরিবর্তন এনেছে। তবে এই স্বস্তি স্থায়ী করতে হলে শুধু নিবন্ধনহীন যানবাহনের বিরুদ্ধে অভিযান চালালেই হবে না; সড়ক থেকে হকার উচ্ছেদ, যানবাহনের শৃঙ্খলাপূর্ণ পার্কিং, গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা এবং মিশুকের ভাড়া নিয়ন্ত্রণেও কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন। অন্যথায় যানজটের ভোগান্তি কমলেও বাড়তি ভাড়া ও বিশৃঙ্খল চলাচলের কারণে নগরবাসীর দুর্ভোগ থেকেই যাবে।
আপনার মতামত লিখুন :