

ঘর পরিষ্কার করার সময় মেঝে, জানালা, দরজা, আলমারি কিংবা পর্দার দিকে সবার নজর থাকে। কিন্তু মাথার ওপর থাকা সিলিং ফ্যানের কথা অনেক সময় মনে থাকে না। মাসের পর মাস ফ্যানের ব্লেডে জমতে থাকে ধুলো, ময়লা ও তেলচিটে আস্তরণ। ফ্যান চালু করলে সেই ধুলো বাতাসে ছড়িয়ে পড়তে পারে।
তবে সিলিং ফ্যান পরিষ্কার করাও বেশ ঝামেলার কাজ। ব্লেডে হাত পৌঁছাতে অনেক সময় মই বা স্টেপল্যাডারে উঠতে হয়। আবার শুকনো কাপড় দিয়ে মুছতে গেলে ধুলো বিছানা, সোফা ও মেঝেতে ছড়িয়ে পড়তে পারে। কিছু সহজ কৌশল মেনে চললে নিরাপদে এবং কম ঝামেলায় সিলিং ফ্যান পরিষ্কার করা সম্ভব।
এক্সটেন্ডেবল ডাস্টার হতে পারে সহজ সমাধান
ঘরের সিলিং ফ্যান যদি তুলনামূলক উঁচুতে থাকে, তাহলে এক্সটেন্ডেবল ডাস্টার বেশ কাজে আসতে পারে। এর হাতল প্রয়োজন অনুযায়ী লম্বা করা যায়। ফলে অনেক ক্ষেত্রে মই বা স্টেপল্যাডারে ওঠার প্রয়োজন হয় না।
ডাস্টারের মাথায় মাইক্রোফাইবার থাকলে সেটি দিয়ে ফ্যানের ব্লেড ধীরে ধীরে মুছে নেওয়া যায়। মাইক্রোফাইবার কাপড় ধুলো ভালোভাবে ধরে রাখে। ফলে সাধারণ ঝাড়ু ব্যবহারের তুলনায় ধুলো চারদিকে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কাও কম থাকে।
তবে ফ্যান পরিষ্কার করার আগে অবশ্যই বিদ্যুৎ সংযোগ বন্ধ করতে হবে। শুধু রিমোট বা সুইচ দিয়ে ফ্যান বন্ধ করাই যথেষ্ট নয়। সম্ভব হলে সুইচবোর্ড থেকে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে ফ্যান পুরোপুরি থেমে যাওয়ার পর পরিষ্কার করা উচিত।
ভ্যাকুয়াম ক্লিনারেও সরানো যায় ধুলো
বাড়িতে ভ্যাকুয়াম ক্লিনার থাকলে ফ্যানের ব্লেডে জমে থাকা শুকনো ধুলো প্রথমে ভ্যাকুয়াম করে নেওয়া যায়। এতে ধুলো বাতাসে বা ঘরের অন্য জায়গায় ছড়িয়ে পড়ার বদলে সরাসরি ভ্যাকুয়াম ক্লিনারে চলে যায়।
বিশেষ করে দীর্ঘদিন ফ্যান পরিষ্কার না করলে আগে ভ্যাকুয়াম ক্লিনার দিয়ে ধুলোর মোটা স্তর সরিয়ে নেওয়া ভালো। এরপর প্রয়োজন হলে সামান্য ভেজা মাইক্রোফাইবার কাপড় দিয়ে ব্লেড মুছে নিতে পারেন।
পুরোনো বালিশের কভারও কাজে লাগবে
সিলিং ফ্যান পরিষ্কারের সহজ একটি কৌশল হলো পুরোনো বালিশের কভার ব্যবহার করা। ফ্যান বন্ধ করার পর একটি ব্লেডের ওপর পুরো বালিশের কভারটি পরিয়ে দিন। এরপর ধীরে ধীরে কভারটি ব্লেডের ওপর দিয়ে টেনে আনুন।
এতে ব্লেডের ওপর জমে থাকা ধুলো কভারের ভেতরে আটকে যায়। ফলে ধুলো মেঝে, বিছানা বা আসবাবের ওপর ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা কমে। একইভাবে ফ্যানের প্রতিটি ব্লেড পরিষ্কার করা যায়।
খেয়াল রাখবেন, কভার টানার সময় বেশি জোর প্রয়োগ করা যাবে না। অতিরিক্ত চাপ দিলে ফ্যানের ব্লেড বাঁকা বা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
নিচের আসবাবপত্র ঢেকে রাখুন
ফ্যান পরিষ্কার করার আগে তার নিচে থাকা বিছানা, সোফা বা অন্যান্য আসবাবপত্র ঢেকে রাখা ভালো। পুরোনো চাদর, খবরের কাগজ বা বড় কাপড় বিছিয়ে দিলে পরিষ্কারের সময় নিচে পড়া ধুলো সহজে সরানো যায়।
ফ্যানে অনেক দিন ধরে ধুলো জমে থাকলে এই ব্যবস্থা আরও জরুরি। কারণ প্রথমবার পরিষ্কার করার সময় ব্লেড থেকে বেশ খানিকটা ধুলো নিচে পড়তে পারে।
লম্বা ঝাড়ু দিয়েও পরিষ্কার করা যায়
এক্সটেন্ডেবল ডাস্টার না থাকলে লম্বা ঝাড়ু দিয়েও ফ্যান পরিষ্কার করা সম্ভব। ঝাড়ুর মাথায় পুরোনো সুতির কাপড়, বালিশের কভার বা মাইক্রোফাইবার তোয়ালে ভালোভাবে বেঁধে নিতে পারেন।
এরপর কাপড়টি সামান্য ভিজিয়ে ব্লেড মুছে নেওয়া যায়। প্রয়োজনে মৃদু ক্লিনিং সলিউশন ব্যবহার করা যেতে পারে।
তবে কাপড় অতিরিক্ত ভেজা রাখা যাবে না। পানি চুইয়ে পড়ার মতো ভেজা কাপড় ব্যবহার করলে পানি ফ্যানের মোটর বা বৈদ্যুতিক অংশে ঢুকে যেতে পারে।
বেশি ধুলো থাকলে আগে শুকনোভাবে পরিষ্কার করুন
ফ্যানের ব্লেডে যদি মোটা করে ধুলো জমে থাকে, তাহলে প্রথমেই ভেজা কাপড় ব্যবহার না করাই ভালো। এতে ধুলো ও ময়লা পানির সঙ্গে মিশে ব্লেডে আরও বেশি লেগে যেতে পারে।
প্রথমে শুকনো মাইক্রোফাইবার কাপড়, বালিশের কভার বা ভ্যাকুয়াম ক্লিনার দিয়ে আলগা ধুলো সরিয়ে নিন। এরপর সামান্য ভেজা কাপড় দিয়ে ব্লেড পরিষ্কার করুন।
নিয়মিত ফ্যান পরিষ্কার করার ক্ষেত্রেও এই দুই ধাপ অনুসরণ করলে কাজ সহজ হয়।
রান্নাঘরের কাছের ফ্যানে তেলচিটে ময়লা হলে
রান্নাঘর বা রান্নাঘরের কাছাকাছি থাকা ফ্যানে শুধু ধুলো নয়, বাতাসের সঙ্গে আসা তেলচিটে আস্তরণও জমতে পারে। এ ধরনের ময়লা শুকনো কাপড়ে সহজে উঠতে চায় না।
এ ক্ষেত্রে অল্প পরিমাণ মৃদু সাবান পানিতে মিশিয়ে একটি মাইক্রোফাইবার কাপড় সামান্য ভিজিয়ে নেওয়া যায়। কাপড়টি ভালোভাবে নিংড়ে নিয়ে ব্লেড মুছতে হবে। এরপর পরিষ্কার ও শুকনো কাপড় দিয়ে ব্লেড মুছে নিতে হবে।
কোনো ধরনের ক্লিনিং সলিউশন সরাসরি ফ্যানের মোটর বা বৈদ্যুতিক অংশে স্প্রে করা উচিত নয়। ফ্যানের প্রস্তুতকারকের নির্দেশনা থাকলে সেটিই অনুসরণ করা সবচেয়ে নিরাপদ।
ফ্যান পরিষ্কারের সময় যে ভুলগুলো করবেন না
সিলিং ফ্যান পরিষ্কার করার সময় তাড়াহুড়ো করলে দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। তাই কয়েকটি বিষয় অবশ্যই মনে রাখতে হবে।
চালু অবস্থায় ফ্যান পরিষ্কার করবেন না। ফ্যান পুরোপুরি থেমে যাওয়ার পর কাজ শুরু করুন এবং সম্ভব হলে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন রাখুন।
চেয়ারের ওপর দাঁড়িয়ে পরিষ্কার করবেন না। প্রয়োজন হলে স্থির ও নিরাপদ স্টেপল্যাডার ব্যবহার করুন। খুব উঁচু ফ্যান হলে লম্বা হাতলের ডাস্টার ব্যবহার করাই নিরাপদ।
ব্লেডে বেশি চাপ দেবেন না। অতিরিক্ত চাপ দিলে ব্লেড বাঁকা হয়ে যেতে পারে। এতে পরে ফ্যানের ভারসাম্যে সমস্যা তৈরি হতে পারে।
ফ্যানে সরাসরি পানি দেবেন না। ভেজা কাপড় ব্যবহার করলেও সেটি ভালোভাবে নিংড়ে নিতে হবে।
মোটর বা বৈদ্যুতিক অংশে ক্লিনার স্প্রে করবেন না। তরল সরাসরি বৈদ্যুতিক অংশে গেলে ক্ষতির ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
ভেজা অবস্থায় ফ্যান চালাবেন না। পরিষ্কার করার পর ফ্যানের সব অংশ ভালোভাবে শুকিয়ে যাওয়ার পর বিদ্যুৎ সংযোগ চালু করুন।
কত দিন পরপর ফ্যান পরিষ্কার করবেন
ফ্যান কত দ্রুত নোংরা হবে তা ঘরের পরিবেশের ওপর নির্ভর করে। ধুলোময় এলাকা, রান্নাঘরের কাছাকাছি জায়গা কিংবা বেশি খোলা জানালা রয়েছে এমন ঘরে ফ্যানে তুলনামূলক দ্রুত ধুলো জমতে পারে।
তাই নির্দিষ্ট সময়ের অপেক্ষা না করে কয়েক সপ্তাহ পরপর ফ্যান পরীক্ষা করে দেখা ভালো। ধুলো জমতে শুরু করলে হালকা করে পরিষ্কার করে নিন। নিয়মিত ধুলো সরিয়ে রাখলে পরে একসঙ্গে অনেক বেশি ময়লা পরিষ্কার করার ঝামেলা কমে।
সহজে ফ্যান পরিষ্কারের ধাপ
ফ্যান পরিষ্কার করতে চাইলে কয়েকটি ধাপে কাজটি করা যায়।
প্রথমে ফ্যানের বিদ্যুৎ সংযোগ বন্ধ করুন এবং ফ্যান পুরোপুরি থেমে যাওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করুন। এরপর ফ্যানের নিচে পুরোনো চাদর, খবরের কাগজ বা বড় কাপড় বিছিয়ে দিন।
প্রথমে এক্সটেন্ডেবল মাইক্রোফাইবার ডাস্টার, বালিশের কভার বা ভ্যাকুয়াম ক্লিনার দিয়ে ব্লেডের ওপর জমে থাকা শুকনো ধুলো সরিয়ে নিন। এরপর প্রয়োজন হলে সামান্য ভেজা মাইক্রোফাইবার কাপড় দিয়ে ব্লেডের ওপর ও নিচের অংশ মুছে নিন।
মোটর ও ফ্যানের অন্যান্য বৈদ্যুতিক অংশ পরিষ্কার করার সময় সরাসরি পানি বা ক্লিনিং সলিউশন ব্যবহার করবেন না। প্রয়োজন হলে শুকনো বা খুব সামান্য ভেজা কাপড় ব্যবহার করুন।
সবশেষে ফ্যানের প্রতিটি অংশ ভালোভাবে শুকিয়ে যাওয়ার পর বিদ্যুৎ সংযোগ চালু করুন।
সিলিং ফ্যান পরিষ্কার করার জন্য সব সময় দামি কোনো পণ্য বা বিশেষ যন্ত্রপাতির প্রয়োজন হয় না। পুরোনো বালিশের কভার, মাইক্রোফাইবার কাপড়, ভ্যাকুয়াম ক্লিনার বা লম্বা হাতলের ডাস্টার দিয়েই কাজটি করা যায়।
তবে ফ্যান পরিষ্কার করার ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো নিরাপত্তা। ফ্যানের নিচে ঝুঁকিপূর্ণভাবে চেয়ার বা আসবাবের ওপর উঠে কাজ না করে নিরাপদ পদ্ধতি বেছে নেওয়া উচিত। নিয়মিত পরিষ্কার করলে ফ্যানে ধুলোর স্তরও বেশি জমবে না এবং ঘর পরিষ্কার রাখার কাজও সহজ হবে।
আপনার মতামত লিখুন :