
নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে সাত খুনের রায় দ্রুত কার্যকরের দাবিতে মানববন্ধন
নারায়ণগঞ্জে আলোচিত সাত খুন মামলার রায় দ্রুত কার্যকর করার দাবিতে মানববন্ধন করেছেন নিহতদের স্বজন ও এলাকাবাসী। সোমবার (২৭ এপ্রিল) বেলা ১১টার সিদ্ধিরগঞ্জের মৌচাক বাসস্ট্যান্ড এলাকায় ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে এ কর্মসূচি পালিত হয়।
মানববন্ধনে অংশ নিয়ে নিহতদের পরিবারের স্বজনরা ও স্থানীয় বাসিন্দারা বর্তমান সরকারের নিকট হত্যাকারীদের বিচার দাবি করেন।
মানববন্ধনে অংশ নিয়ে খুন হওয়া নজরুল ইসলামের স্ত্রী সেলিনা ইসলাম বিউটি বলেন, ‘২০১৪ সালে যে নির্মম হত্যাকাণ্ড ঘটেছিল, তা দেশবাসী সবাই জানেন এবং দেখেছেন। নূর হোসেন নামের এক মাফিয়া কিভাবে টাকার প্রভাবে র্যাব সদস্যদের ব্যবহার করে অমানবিক নির্যাতনের মাধ্যমে হত্যা করে মরদেহ শীতলক্ষ্যা নদীতে ফেলে দিয়েছিল—সেই দৃশ্য দেখে সারাদেশের মানুষ কেঁদেছিল। পুরো জাতি তখন আমাদের পাশে দাঁড়িয়েছিল।
আজ হয়তো ভয়-ভীতি, মামলা ও আতঙ্কের কারণে অনেকেই সামনে আসতে সাহস পান না। কিন্তু আমরা তো আমাদের আপনজন হারিয়েছি। আমরা পরিবারগুলো ১২ বছর ধরে বুকভরা কান্না আর অসহনীয় কষ্ট নিয়ে বেঁচে আছি। আমাদের একটাই দাবি—নজরুলসহ সাত পরিবারের এই নির্মম হত্যার বিচার যেন আমরা জীবিত অবস্থায় দেখে যেতে পারি।’
‘আমরা জানতে চাই, কেন র্যাব সদস্যরা নূর হোসেনের কথায় এত ভয়ংকর হত্যাকাণ্ড ঘটালো? কেন সাতটি পরিবারকে ধ্বংস করে দিল? যদি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছেই মানুষ নিরাপত্তা না পায়, তাহলে মানুষ কার কাছে যাবে? র্যাবের ওপর যে কলঙ্কের দাগ লেগেছে, তা মুছতে হলে এই মামলার বিচার দ্রুত কার্যকর করতে হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘সাংবাদিকরা শুরু থেকে আজ পর্যন্ত আমাদের পাশে ছিলেন, এজন্য আমরা কৃতজ্ঞ। সে সময় দেশের মানুষও আমাদের পাশে ছিল। সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া এসেছিলেন এবং বলেছিলেন, বিএনপি ক্ষমতায় এলে এই হত্যার বিচার অগ্রাধিকার ভিত্তিতে করা হবে। এখন আমরা আশা করি, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সেই প্রতিশ্রুতি রক্ষা করবেন এবং সাতটি পরিবারের পাশে দাঁড়াবেন।’
সেলিনা ইসলাম বলেন, ‘আমরা অ্যাটর্নি জেনারেল, আইনমন্ত্রী এবং সংশ্লিষ্ট সকল দায়িত্বশীল কর্মকর্তার প্রতি আহ্বান জানাই—তারা যেন এই মামলার রায়ের দিকে বিশেষ দৃষ্টি দেন এবং দ্রুত কার্যকরের ব্যবস্থা করেন। আমরা আশা করি, ২০২৬ সালের মধ্যেই এই রায় কার্যকর হবে।
আমাদের প্রিয় মানুষগুলো আর কখনো ফিরে আসবে না। কিন্তু অন্তত পৃথিবীতে বিচার দেখে যেতে চাই। দেশের সর্বোচ্চ মহলের কাছে আমাদের আকুল আবেদন—সাতটি পরিবারের কান্না ও কষ্টের দিকে তাকিয়ে দ্রুত এই বিচার সম্পন্ন করুন। এটাই আমাদের শেষ আশা।’
মৃত জাহাঙ্গীরের স্ত্রী সামছুন নাহার নুপুর বলেন, ‘আমার স্বামীসহ সাতজন মানুষকে হত্যা করা হয়েছে। আমি জানি, আমার স্বামী আর কোনোদিন ফিরে আসবে না। কিন্তু ১২ বছর পেরিয়ে গেলেও এখনো এই হত্যাকাণ্ডের ফাঁসির রায় কার্যকর হয়নি। আমি চাই, দ্রুত সেই রায় কার্যকর করা হোক।
যখন আমার স্বামীকে হত্যা করা হয়, তখন আমার সন্তান মাত্র সাত মাসের ছিল। আজ সে বড় হচ্ছে, বাবাকে খোঁজে, কিন্তু আমি তাকে তার বাবাকে ফিরিয়ে দিতে পারি না। একজন সন্তান যখন “বাবা, বাবা” বলে ডাকে, তখন আমার বুকটা ভেঙে যায়। আমি আমার সন্তানের জন্য একটি নিরাপদ ও নিশ্চিত ভবিষ্যৎ চাই।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমার স্বামী বলেছিলেন, তিনি আমাদের ভরণপোষণের দায়িত্ব পালন করবেন, পরিবারকে আগলে রাখবেন। কিন্তু আজ তিনি নেই, আর আমাদের দায়িত্ব নেওয়ার মতোও কেউ নেই। আমি একজন মা হয়ে সবকিছু সামলাতে হিমশিম খাচ্ছি।
আমি বর্তমান সরকারের কাছে আবেদন জানাই, বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানসহ সংশ্লিষ্ট নেতৃবৃন্দ যেন এই সাত খুনের মামলার দিকে গুরুত্ব দেন এবং দ্রুত কঠোর বিচার নিশ্চিত করেন। আর যেন ১২ বছর, ১৩ বছর করে বিচার ঝুলে না থাকে।’
সামছুন নাহার নুপুর বলেন, ‘এই হত্যাকাণ্ডে শুধু সাতজন মানুষ মারা যাননি, ধ্বংস হয়েছে সাতটি পরিবার। কেউ বাবা হারিয়েছে, কেউ ভাই, কেউ সন্তান, আর আমি হারিয়েছি আমার স্বামী। নিহতদের পরিবারগুলো আজও অসহায় কষ্টে দিন কাটাচ্ছে।
যারা এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে, তারা আজও বেঁচে আছে, ভালোভাবে দিন কাটাচ্ছে। অথচ সাতটি তরতাজা প্রাণ নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে। এটা ভাবলে বুক ফেটে যায়। আমি চাই, এমন ঘটনা আর কোনো মায়ের কোল খালি না করুক, কোনো সন্তান বাবাহারা না হোক, আর কোনো নারী আমার মতো বিধবা হয়ে এ কষ্ট বয়ে না বেড়াক।
আমি দেশের মানুষ, গণমাধ্যম এবং সরকারের কাছে আকুল আবেদন জানাই—আমার স্বামীর হত্যাসহ সাতজনের হত্যার বিচার দ্রুত কার্যকর করুন। এটাই আমার শেষ দাবি, এটাই আমার ন্যায়বিচারের আর্তনাদ।’
নিহত তাজুল ইসলামের পিতা আবুল খায়ের বলেন, ‘সাড়ে আট বছরের মতো এখনো সে মামলা আপিল বিভাগে ঝুলে আছে এবং কেন সেটি আপিল বিভাগে ঝুলে আছে তা আমাদের বোধগম্য নয় এখন আমাদের একটাই দাবি, সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া আমাদের এখানে এসে আমাদের মাথায় হাত ভুলিয়ে দিয়ে বলেছিলেন, ‘বিএনপি সরকার ক্ষমতায় এলে সর্বপ্রথম আমরা সাত খুনের মামলার বিচার করব।’ আমরা এখন বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দিকে তাকিয়ে আছি। তার মায়ের দেওয়া ওয়াদা তিনি পূরণ করবেন বলে তিনি আশাবাদী।’
উল্লেখ্য, ২০১৪ সালের ২৭ এপ্রিল ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক সড়ক থেকে তৎকালীন প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলাম, আইনজীবী চন্দন কুমার সরকারসহ মোট সাতজনকে গুম করা হয়। তিনদিন পর নারায়ণগঞ্জের শীতলক্ষ্যা নদী থেকে নিখোঁজদের মরদেহ ভাসমান অবস্থায় উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় নজরুল ইসলামের স্ত্রী সেলিনা ইসলাম বিউটি ও চন্দন কুমার সরকারের জামাতা বিজয় কুমার পাল দুটি হত্যা মামলা করেন। এসব মামলার বিচারিক প্রক্রিয়া বর্তমানে আপিল বিভাগে চলমান রয়েছে।
আপনার মতামত লিখুন :