

রান্নাঘরের এই ৫ জিনিস কতদিন পর বদলাবেন, জানাচ্ছেন পুষ্টিবিদ
রান্নাঘর এমন একটি জায়গা, যেখানে প্রতিদিন খাবার তৈরি হয়। তাই সেখানে ব্যবহৃত বাসন, কাটিং বোর্ড, স্ক্রাবার, খাবার রাখার পাত্র থেকে শুরু করে পরিষ্কার করার সামগ্রী, সবকিছুর সঙ্গেই খাবারের সরাসরি বা পরোক্ষ যোগাযোগ থাকে। অথচ এসব জিনিসের অনেকগুলোই আমরা বছরের পর বছর ব্যবহার করি। কখন বদলাতে হবে বা কোন জিনিসের বিকল্প ব্যবহার করা ভালো, তা নিয়ে খুব একটা ভাবা হয় না।
সম্প্রতি ভারতীয় পুষ্টিবিদ রাশি চৌধুরী রান্নাঘরের এমন পাঁচটি সাধারণ জিনিসের কথা বলেছেন, যেগুলো নিয়মিত ব্যবহারে বদলে ফেলার কথা ভাবা যেতে পারে।
তবে এর অর্থ এই নয় যে এসব জিনিস ব্যবহার করলেই শরীরে বিষ ঢুকছে। বরং সঠিকভাবে ব্যবহার, পরিষ্কার রাখা এবং ক্ষতিগ্রস্ত হলে সময়মতো বদলে ফেলাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
পুরোনো স্ক্রাবারের বদলে কী ব্যবহার করবেন?
বাসন পরিষ্কার করার জন্য ব্যবহৃত স্ক্রাবার প্রতিদিন পানির সংস্পর্শে থাকে। খাবারের কণা, তেল ও আর্দ্রতা জমে থাকলে সেখানে জীবাণু বৃদ্ধির সুযোগ তৈরি হতে পারে। পুষ্টিবিদ রাশি চৌধুরী হলুদ রঙের সিন্থেটিক স্ক্রাবারের বদলে নারকেলের ছোবড়ার তৈরি স্ক্রাবার ব্যবহারের পরামর্শ দিয়েছেন। তার বক্তব্য অনুযায়ী, ব্যবহারের সময় কিছু প্লাস্টিকজাত তন্তু আলাদা হয়ে বাসনে লেগে যেতে পারে।
তবে স্ক্রাবার থেকে প্লাস্টিকের কণা খাবারে গিয়ে মানুষের স্বাস্থ্যে নির্দিষ্ট ক্ষতি করে, এমন শক্ত প্রমাণ এই প্রতিবেদনে দেওয়া হয়নি। তাই বিষয়টিকে নিশ্চিত স্বাস্থ্যঝুঁকি হিসেবে দেখার বদলে একটি সতর্কতামূলক পরামর্শ হিসেবে দেখা ভালো।
যে ধরনের স্ক্রাবারই ব্যবহার করা হোক, সেটি পরিষ্কার করে শুকনো জায়গায় রাখা এবং অতিরিক্ত নোংরা বা ক্ষতিগ্রস্ত হলে বদলে ফেলা জরুরি।
কাটিং বোর্ডে শুধু কাঠ দেখলেই ভয় পাওয়ার কারণ নেই
কাঁচা মাছ, মাংস, মুরগি বা সবজি কাটতে কাটিং বোর্ড অপরিহার্য। দীর্ঘদিন ব্যবহারে বোর্ডে ছুরি দিয়ে তৈরি গভীর দাগ ও খাঁজ তৈরি হতে পারে। এসব খাঁজ ভালোভাবে পরিষ্কার করা কঠিন হয়ে গেলে জীবাণু জমে থাকার ঝুঁকি বাড়তে পারে।
কাঠের কাটিং বোর্ডের বদলে স্টিলের বোর্ড ব্যবহারের স্বাস্থ্যকর বলে জানায় বিভিন্ন গবেষণা।
তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে। কাঠের কাটিং বোর্ড নিজেই অনিরাপদ, এমন নয়। মার্কিন কৃষি বিভাগ (USDA) বলছে, কাঠ ও প্লাস্টিক, দু ধরনের কাটিং বোর্ডই সঠিকভাবে পরিষ্কার ও জীবাণুমুক্ত করা যায়। তবে বোর্ড অতিরিক্ত ক্ষয়ে গেলে বা এমন গভীর খাঁজ তৈরি হলে যা সহজে পরিষ্কার করা যায় না, সেটি বদলে ফেলা উচিত।
তাই শুধু কাঠের তৈরি বলে কাটিং বোর্ড ফেলে দেওয়ার প্রয়োজন নেই। বরং বোর্ডের অবস্থা দেখুন।
যে লক্ষণগুলো দেখলে বদলাবেন-
গভীর ও অসংখ্য খাঁজ তৈরি হয়েছে
পরিষ্কার করার পরও দাগ বা গন্ধ থেকে যায়
বোর্ডের অংশ ভেঙে যাচ্ছে
পৃষ্ঠ অসমান হয়ে গেছে
ছত্রাকের দাগ দেখা যাচ্ছে
কাঁচা মাংস ও সবজির জন্য আলাদা কাটিং বোর্ড ব্যবহার করাও ভালো অভ্যাস। এতে cross-contamination বা এক খাবার থেকে অন্য খাবারে জীবাণু ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি কমে।
আঁচড়ধরা নন-স্টিক প্যান কি ফেলে দিতে হবে?
নন-স্টিক প্যানের সুবিধা হলো এতে কম তেলে রান্না করা যায় এবং খাবার সহজে আটকে যায় না। কিন্তু দীর্ঘদিন ব্যবহারে এর আবরণে আঁচড় পড়তে পারে।
পুষ্টিবিদ রাশি চৌধুরী আঁচড়ধরা নন-স্টিক প্যানের বদলে কাস্ট আয়রনের প্যান ব্যবহারের পরামর্শও দিয়েছেন।
এখানে অবশ্যই সতর্ক থাকা দরকার। নন-স্টিক প্যানের আবরণ উঠে যাওয়া মানেই তা বিষাক্ত হয়ে খাবারে মিশছে এবং গুরুতর অসুস্থতা তৈরি করবে, এমন সরল সিদ্ধান্ত বৈজ্ঞানিকভাবে ঠিক নয়। খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসন (FDA) খাদ্যের সংস্পর্শে ব্যবহারের জন্য নির্দিষ্ট নন-স্টিক আবরণ অনুমোদন করেছে এবং খাদ্যের সংস্পর্শে ব্যবহৃত এসব উপাদানের নিরাপত্তা মূল্যায়ন করে।
তবে প্যানের আবরণ যদি খুব বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়, উঠে যেতে থাকে বা পৃষ্ঠে গভীর আঁচড় পড়ে, তখন সেটি বদলে ফেলাই ভালো। বিশেষ করে নির্মাতার ব্যবহারের নির্দেশনা মেনে চলা উচিত।
কাস্ট আয়রন, স্টেইনলেস স্টিল বা অন্য কোনো উপযোগী প্যান ব্যবহার করা যেতে পারে। কোনটি ভালো, তা রান্নার ধরন ও ব্যক্তিগত পছন্দের ওপরও নির্ভর করে।
গরম খাবার সরাসরি প্লাস্টিকের পাত্রে রাখা কি ঠিক?
এটি পাঁচটি পরামর্শের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি।
অনেক বাড়িতে রান্না করা গরম ভাত, তরকারি বা ডাল সরাসরি প্লাস্টিকের পাত্রে ঢেলে ঢাকনা লাগিয়ে রাখা হয়। কিন্তু সব প্লাস্টিক পাত্র একই ধরনের নয়। কিছু পাত্র নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় খাবার রাখার জন্য তৈরি, আবার কিছু শুধু ঠান্ডা বা ঘরের তাপমাত্রার খাবারের জন্য উপযোগী।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) জানিয়েছে, খাবারের সংস্পর্শে থাকা প্লাস্টিক বা অন্য উপাদান থেকে কিছু রাসায়নিক খাবারে স্থানান্তরিত হতে পারে এবং খাবার গরম করার মতো পরিস্থিতিতে এই migration বিবেচনার বিষয়। সঠিকভাবে তৈরি ও ব্যবহৃত খাদ্য সংরক্ষণ সামগ্রী এই ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে।
freeze
ভাত, মাছ-মাংস ও সবজি ফ্রিজে কত দিন ভালো থাকে
তাই গরম খাবার রাখার ক্ষেত্রে পাত্রের লেবেল ও প্রস্তুতকারকের নির্দেশনা দেখা গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে-
গরম খাবারের জন্য উপযোগী নয় এমন প্লাস্টিক পাত্রে খাবার ঢালবেন না
মাইক্রোওয়েভে ব্যবহারযোগ্য নয় এমন পাত্রে খাবার গরম করবেন না
পাত্র অতিরিক্ত পুরোনো, ফেটে যাওয়া বা বিকৃত হলে বদলে ফেলুন
গরম খাবার সংরক্ষণের জন্য কাচ বা স্টিলের পাত্র ব্যবহার করা সহজ বিকল্প হতে পারে
তবে সব প্লাস্টিক পাত্রকে বিষাক্ত বলা ঠিক নয়। পাত্রের ধরন ও ব্যবহারের নিয়মই এখানে মূল বিষয়।
কেটলি বা কলের সাদা আস্তরণ পরিষ্কার করবেন কীভাবে?
রান্নাঘরের কল, কেটলি বা পানির সংস্পর্শে থাকা ধাতব অংশে অনেক সময় সাদা বা ধূসর আস্তরণ দেখা যায়। সাধারণত পানিতে থাকা খনিজ জমে এই ধরনের আস্তরণ তৈরি হতে পারে।
পুষ্টিবিদরা এই ধরনের আস্তরণ পরিষ্কার করতে শক্তিশালী বাথরুম ক্লিনারের বদলে সাদা ভিনেগার ব্যবহারের পরামর্শ দেন।
তবে এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো পরিষ্কার করার পর পৃষ্ঠ ভালোভাবে ধুয়ে নেওয়া। রান্নাঘরের খাবার প্রস্তুতের জায়গায় বাথরুমের শক্তিশালী ক্লিনার ব্যবহারের ক্ষেত্রে পণ্যের লেবেল ও ব্যবহারের নির্দেশনা মেনে চলতে হবে।
আর একটি বিষয় অবশ্যই মনে রাখতে হবে, কোনো ধরনের পরিষ্কারক একসঙ্গে মেশানো যাবে না। বিশেষ করে ব্লিচের সঙ্গে অ্যামোনিয়া বা অন্য কিছু পরিষ্কারক মিশলে বিষাক্ত গ্যাস তৈরি হতে পারে। EPA এ বিষয়ে স্পষ্টভাবে সতর্ক করেছে।
তাই ঘরোয়া পরিষ্কার করার সময় একটি পণ্য ব্যবহার করে সেটি ভালোভাবে ধুয়ে নেওয়ার পর প্রয়োজন হলে অন্য পণ্য ব্যবহার করুন। কখনোই একাধিক রাসায়নিক একসঙ্গে মেশাবেন না।
রান্নাঘরকে নিরাপদ রাখতে আরও কয়েকটি বিষয়
রান্নাঘরের নিরাপত্তা শুধু পাঁচটি জিনিস বদলানোর ওপর নির্ভর করে না। প্রতিদিনের কিছু অভ্যাসও গুরুত্বপূর্ণ।
কাঁচা ও রান্না করা খাবার আলাদা রাখুন
কাঁচা মাংস, মুরগি বা মাছ কাটার পর একই বোর্ড বা ছুরি পরিষ্কার না করে রান্না করা খাবারে ব্যবহার করলে জীবাণু ছড়িয়ে পড়তে পারে। তাই প্রতিটি খাবার প্রস্তুতের পর বোর্ড, ছুরি ও অন্যান্য সরঞ্জাম ভালোভাবে পরিষ্কার করা উচিত।
কাটিং বোর্ড শুধু পানি দিয়ে ধোবেন না
মার্কিন কৃষি বিভাগ কাটিং বোর্ড গরম সাবান পানিতে পরিষ্কার করার পরামর্শ দেয়। প্রয়োজন হলে সঠিক পদ্ধতিতে জীবাণুমুক্তও করা যায়।
ক্ষতিগ্রস্ত রান্নার সামগ্রী বদলান
প্যানের আবরণ উঠে গেলে, প্লাস্টিকের পাত্র ফেটে গেলে বা কাটিং বোর্ডে গভীর খাঁজ তৈরি হলে শুধু পরিষ্কার করে বছরের পর বছর ব্যবহার না করাই ভালো।
রান্নাঘরে রাসায়নিক ব্যবহারে সতর্ক থাকুন
খাবার তৈরির জায়গায় পরিষ্কারক ব্যবহারের পর পৃষ্ঠ ভালোভাবে পরিষ্কার করতে হবে। রাসায়নিকের গন্ধ আছে এমন অবস্থায় খাবার প্রস্তুত করা উচিত নয়।
সন্দেহজনক নিম্নমানের রান্নার পাত্র এড়িয়ে চলুন
রান্নার সামগ্রী কেনার সময় শুধু দাম নয়, পণ্যের মান ও নিরাপত্তার তথ্যও দেখা উচিত। FDA কিছু আমদানি করা রান্নার পাত্রে খাদ্যে সীসা চলে যাওয়ার ঝুঁকি শনাক্ত করে ভোক্তাদের সতর্ক করেছে।
তাহলে রান্নাঘরের কোন ৫টি জিনিস বদলানোর কথা ভাববেন?
সহজ করে বললে, শুধু কোনো একটি উপাদানের নাম দেখে সিদ্ধান্ত না নিয়ে জিনিসটির অবস্থা, ব্যবহারের ধরন এবং খাদ্যের সঙ্গে তার সংস্পর্শ বিবেচনা করা উচিত।
স্ক্রাবার: অতিরিক্ত পুরোনো বা নোংরা হলে বদলান।
কাটিং বোর্ড: গভীর খাঁজ ও পরিষ্কার করা কঠিন দাগ তৈরি হলে বদলান।
নন-স্টিক প্যান: আবরণ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলে নতুনটি নিন।
প্লাস্টিকের পাত্র: গরম খাবার রাখার জন্য উপযোগী না হলে কাচ বা স্টিল বেছে নিন।
পরিষ্কারক: খাবারের জায়গায় ব্যবহারের সময় লেবেলের নির্দেশনা মেনে চলুন এবং কোনো রাসায়নিক একসঙ্গে মেশাবেন না।
রান্নাঘরকে ভয় পাওয়ার জায়গা নয়, বরং সচেতনভাবে ব্যবহারের জায়গা হিসেবে দেখা উচিত। পুরোনো স্ক্রাবার, গভীর খাঁজধরা কাটিং বোর্ড, ক্ষতিগ্রস্ত নন-স্টিক প্যান বা অনুপযুক্ত প্লাস্টিকের পাত্র দীর্ঘদিন ব্যবহার না করাই ভালো।
তবে কোনো একটি রান্নাঘরের সামগ্রীকে সরাসরি বিষাক্ত বা প্রাণঘাতী বলে ধরে নেওয়াও ঠিক নয়। কোন জিনিস কীভাবে তৈরি, কীভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে এবং তার অবস্থা কেমন, সেটিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
সবচেয়ে সহজ নিয়ম হলো, ক্ষতিগ্রস্ত জিনিস বদলান, কাঁচা ও রান্না করা খাবার আলাদা রাখুন, খাবারের সংস্পর্শে থাকা জিনিস নিয়মিত পরিষ্কার করুন এবং রান্নাঘরের রাসায়নিক ব্যবহারে সতর্ক থাকুন। এতে বাড়ির রান্নাঘর যেমন পরিষ্কার থাকবে, তেমনি খাদ্যনিরাপত্তার ঝুঁকিও অনেকটাই কমানো সম্ভব।
আপনার মতামত লিখুন :