

লোহিত সাগরে হুতিদের বাধার মুখে সৌদি আরবকে কার্যত নিজেদের সমস্যা নিজেরাই সমাধানের পথে ঠেলে দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এর ফলে হুতিদের বিরুদ্ধে আবারও যুদ্ধে নামা অথবা ইয়েমেনে তাদের নিয়ন্ত্রণ মেনে নেওয়ার মতো কঠিন সিদ্ধান্তের মুখে পড়েছে রিয়াদ। সৌদি আরবের সিদ্ধান্ত শুধু দেশটির নয়, পুরো অঞ্চলের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা ব্যবস্থায় প্রভাব ফেলতে পারে।
গত বৃহস্পতিবার সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান ট্রাম্পকে দুটি ফোন করেন। হোদেইদার কাছে মোকা বন্দর হুতিদের দখলে যাওয়ার পর তিনি ট্রাম্পের সহায়তা চেয়েছিলেন বলে অ্যাক্সিওসের প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। তবে ট্রাম্প সরাসরি সামরিক সহায়তা দিতে রাজি হননি। তিনি শুধু গোয়েন্দা তথ্য দেওয়ার বিষয়ে সম্মতি দিয়েছেন।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র আগেও সৌদি আরবকে এ ধরনের সহায়তা দিয়ে আসছিল।
ট্রাম্পের দৃষ্টিতে, হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে ইরানের সঙ্গে সংঘাতের মতো লোহিত সাগরের এই সংকট যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি সমস্যা নয়। বাব আল-মান্দাব প্রণালিকে তিনি আঞ্চলিক দেশগুলোর বিষয় হিসেবেই দেখছেন। অথচ এই জলপথ দিয়ে বিশ্বের মোট বাণিজ্যের প্রায় ১২ শতাংশ সম্পন্ন হয়।
ওয়াশিংটনের সঙ্গে সৌদি আরবের দীর্ঘদিনের মিত্রতার সীমাবদ্ধতা এর আগেও সামনে এসেছে। ২০১৯ সালে হুতিদের হামলায় সৌদি আরবের তেল স্থাপনা তিনবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। সাম্প্রতিক যুদ্ধেও সৌদি আরব হামলার মুখে পড়েছে। এবার আবার গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যপথ দিয়ে সৌদি তেল পরিবহন বাধাগ্রস্ত হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পারস্য উপসাগর ও লোহিত সাগরকে আলাদা করে দেখার ট্রাম্পের নীতি ইরান ও হুতিদের জন্য আঞ্চলিক বাণিজ্যপথে চাপ তৈরির সুযোগ তৈরি করেছে। এতে হুতিদের শুধু ইরানের প্রক্সি হিসেবে দেখার সুযোগ কমছে। বরং তারা আঞ্চলিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে নিজেদের স্বার্থে সক্রিয় একটি শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছে।
সৌদি আরব গত কয়েক বছরে বিশেষ করে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ শুরুর পর যুক্তরাষ্ট্রের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমানোর চেষ্টা করেছে। ২০২১ সালে কাতারের সঙ্গে বিরোধ মিটিয়ে সম্পর্ক পুনঃস্থাপন করে রিয়াদ। একই সঙ্গে ইরানের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনরায় চালু করে। তুরস্কের সঙ্গে বাণিজ্যিক ও সামরিক সম্পর্কও বাড়িয়েছে। গত সেপ্টেম্বরে পাকিস্তানের সঙ্গে প্রতিরক্ষা চুক্তি করার পর তুরস্ক যুক্ত হওয়ায় সেটি ত্রিপক্ষীয় জোটে রূপ নেয়।
এ সময় সৌদি আরব হুতিদের সঙ্গে ২০২২ সালে হওয়া যুদ্ধবিরতিও বজায় রেখেছিল। হুতিদের নিয়ন্ত্রিত এলাকায় ইয়েমেন সরকারের কর্মীদের বেতন দেওয়ার জন্য অর্থ দিয়েছে রিয়াদ। হুতিদের নিয়ন্ত্রিত বন্দরগুলোতে পণ্য ও তেল পৌঁছানোর সুযোগও দিয়েছে। এমনকি ইয়েমেন থেকে সংযুক্ত আরব আমিরাতের বাহিনী সরিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রেও ভূমিকা রেখেছে।
ইয়েমেনে হুতিদের উত্থান ব্যর্থ হতে পারে
তবে এসব উদ্যোগ যুক্তরাষ্ট্রের জায়গা পুরোপুরি নেওয়ার জন্য নয়; বরং প্রয়োজনের সময় ওয়াশিংটনের ওপর নির্ভরতা কমানো এবং মার্কিন নীতিতে প্রভাব রাখার সক্ষমতা তৈরি করাই ছিল এর লক্ষ্য।
তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান এ ধরনের আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামোর অন্যতম প্রবক্তা। তিনি এর আগে ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর জন্য স্বাধীন নিরাপত্তা কাঠামোর প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছিলেন। পরে একটি আঞ্চলিক প্রতিরক্ষা জোটও গড়ে ওঠে। তবে এখনো এ জোটের এমন কোনো যৌথ সামরিক বাহিনী গড়ে ওঠেনি, যা বর্তমান চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে পারে। হুতিদের বর্তমান তৎপরতাই সেই জোটের জন্য প্রথম বড় পরীক্ষা হয়ে উঠেছে।
এদিকে ট্রাম্পের সঙ্গে বিন সালমানের ফোনালাপ দেখিয়ে দিচ্ছে, সৌদি আরব যতই স্বাধীন নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তোলার কথা বলুক, এখনই যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরতা পুরোপুরি বাদ দেওয়া রিয়াদের জন্য বাস্তবসম্মত নয়।
এ অবস্থায় সৌদি যুবরাজ কঠিন সিদ্ধান্তের মুখে। হুতিদের বিরুদ্ধে আবার সর্বাত্মক যুদ্ধে নামবেন, নাকি আলোচনার পথ বেছে নেবেন—সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। এর আগে হুতিদের বিরুদ্ধে সাত বছর ধরে চলা সামরিক অভিযান থেকে বেরিয়ে আসতে চেয়েছিল সৌদি আরব।
এবার পরিস্থিতি আরও জটিল। কারণ সৌদি আরব একই সঙ্গে ইরান ও হুতিদের দুটি ফ্রন্টের মুখোমুখি। ইরান নিজেদের স্বার্থে প্রতিবেশী দেশগুলোর ওপর হামলাকে চাপ তৈরির কৌশল হিসেবে ব্যবহার করছে। ফলে সৌদি আরব হুতিদের ওপর বড় ধরনের হামলা চালালে ইরানও পাল্টা হামলা চালাতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র সৌদি আরবকে কতটা সামরিক সহায়তা দেবে, তা নিয়েও অনিশ্চয়তা রয়েছে।
অর্থাৎ হুতিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করলে সৌদি আরব শেষ পর্যন্ত ইরানের সঙ্গেও যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে পারে।
তবে ইরান ও হুতিদের লক্ষ্য এক নয়। এই পার্থক্যই সৌদি আরবের জন্য সংকট থেকে বেরিয়ে আসার একটি সুযোগ তৈরি করতে পারে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ইরান হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণের স্বীকৃতি, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, যুদ্ধের ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা এবং মার্কিন সামরিক হুমকি বন্ধ করতে চায়। অন্যদিকে হুতিদের নিজস্ব কিছু দাবি রয়েছে। তারা ইয়েমেনের দখল করা এলাকাগুলোর ওপর নিয়ন্ত্রণের স্বীকৃতি, সৌদি আরবের আকাশপথ অবরোধের অবসান, বড় অঙ্কের আর্থিক সহায়তা এবং ইয়েমেনের শাসনব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা চায়।
তাই হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনায় বসলেই ইয়েমেনের যুদ্ধ শেষ হবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। ইরানের বিষয়গুলো যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করতে হলেও ইয়েমেনের ক্ষেত্রে সৌদি আরবের সরাসরি ভূমিকা রয়েছে।
ট্রাম্প সৌদি আরবকে সরাসরি সামরিক সহায়তা না দেওয়ায় এখন হুতিদের সমস্যা সমাধানের দায়িত্ব কার্যত রিয়াদের ওপরই পড়েছে। ফলে সামরিক পথের বদলে কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক সমঝোতার পথ বেছে নিতে পারে সৌদি আরব। তবে এর মূল্যও কম নয়।
এ ধরনের সমঝোতার ক্ষেত্রে সৌদি আরবকে ইয়েমেনে বড় পরিসরে অর্থনৈতিক সহায়তা বাড়াতে হতে পারে। একই সঙ্গে ইরান থেকে আসা বিমানের জন্য সৌদি আকাশপথ খুলে দেওয়া, হুতি শাসনকে স্বীকৃতি দেওয়া এবং ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারকে রাজনৈতিক ছাড় দিতে চাপ দেওয়ার মতো পদক্ষেপও নিতে হতে পারে।
আরেকটি বড় সমস্যা হলো, হুতিদের হাতে এখন পেরিম দ্বীপ, মোকা বন্দর ও লোহিত সাগরের নৌ চলাচলের ওপর প্রভাব রয়েছে। এসব কৌশলগত অবস্থান সহজে ছেড়ে দেবে—এমন সম্ভাবনা কম। হরমুজ প্রণালিতে ইরানের মতো হুতিরাও তাদের নিয়ন্ত্রণের স্বীকৃতি চাইতে পারে। এমনকি জাহাজ চলাচলের ওপর ফিও আরোপ করতে পারে।
তবে হুতিদের সঙ্গে আলোচনা হলে যুদ্ধের ধরনও বদলে যেতে পারে। বর্তমানে একই সংঘাতের দুটি ফ্রন্টকে আলাদা করে দুটি সংঘাতে পরিণত করা সম্ভব হতে পারে। এতে হরমুজ প্রণালিতে সংকট চললেও অন্তত লোহিত সাগর দিয়ে সৌদি তেল পরিবহনের পথ নিরাপদ রাখার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
শেষ পর্যন্ত সৌদি আরবকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে, ট্রাম্প যে ‘সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতা’ তাদের হাতে তুলে দিয়েছেন, তা কীভাবে কাজে লাগাবে। হুতিদের ছাড় দেওয়ার মূল্য কম, নাকি এমন একটি যুদ্ধে যাওয়ার মূল্য বেশি—যে যুদ্ধ থেকে বড় কোনো লাভ নাও আসতে পারে, সেটিই রিয়াদের সামনে মূল হিসাব।
ট্রাম্প হয়তো বুঝতে পারেন, সৌদি আরব থেকে দূরে সরে যাওয়ার নীতি উল্টো রিয়াদকে সেই পথেই আরও এগিয়ে দিচ্ছে, যে পথে সৌদি আরব কয়েক বছর ধরে হাঁটছে। তা হলো, যুক্তরাষ্ট্রকে বাদ দিয়ে একটি স্বাধীন আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামো গড়ে তোলা।
এর ফলে মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তার প্রধান গ্যারান্টার হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের অবস্থানও দুর্বল হয়ে যেতে পারে। আর সৌদি আরব যদি হুতিদের সঙ্গে স্বাধীনভাবে কূটনৈতিক সমঝোতার পথ বেছে নেয়, তাহলে ইরানের সঙ্গেও ভবিষ্যৎ সম্পর্কের ক্ষেত্রে একই ধরনের কৌশল অনুসরণের দৃষ্টান্ত তৈরি হতে পারে।
তখন আঞ্চলিক দেশগুলো ওয়াশিংটনের শর্তের অপেক্ষায় না থেকে নিজেদের মধ্যে সমঝোতা করতে শুরু করতে পারে। আর যুক্তরাষ্ট্রকে সেই পরিবর্তিত বাস্তবতার সঙ্গে নিজের নীতি মানিয়ে নিতে হতে পারে।
লেখক পরিচিতি: জভি বার’এল হারেৎজ পত্রিকার মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক বিশ্লেষক। তিনি একজন কলামিস্ট ও সম্পাদকীয় বোর্ডের সদস্য। তিনি আরব ও ইসলামী বিশ্ব নিয়ে ব্যাপক লেখালেখি করেছেন।
আপনার মতামত লিখুন :