
ইরানের কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ কেশম দ্বীপে সোমবার (২ নভেম্বর) নতুন করে হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। হরমুজ প্রণালি দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং ইরানি বাহিনীর সম্ভাব্য সামরিক হুমকি ঠেকাতে সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে পরিচালিত ধারাবাহিক সীমিত সামরিক অভিযানের অংশ হিসেবে এ হামলা চালানো হয়েছে। মার্কিন কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে এ তথ্য জানিয়েছে দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালি দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলে ইরানি বাহিনীর হুমকি প্রতিরোধ করাই এসব হামলার মূল উদ্দেশ্য। বিশ্ববাজারে তেল পরিবহনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথের প্রবেশমুখের কাছে অবস্থিত কেশম দ্বীপ।
মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এসব সামরিক অভিযান অধিকাংশ ক্ষেত্রেই জনসমক্ষে ঘোষণা ছাড়াই পরিচালনা করা হয়েছে। ইরানের সামরিক হুমকি নিয়ন্ত্রণে রাখার পাশাপাশি পূর্ণমাত্রার যুদ্ধে ফিরে যাওয়ার কোনো ইঙ্গিত না দেওয়ার লক্ষ্যেই প্রশাসন এমন কৌশল নিয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
কেশম দ্বীপে একটি ভূগর্ভস্থ ক্ষেপণাস্ত্র স্থাপনা, নৌঘাঁটি এবং গুরুত্বপূর্ণ পানি বিশুদ্ধকরণ কেন্দ্র রয়েছে। এর আগে সংঘাতের সময়ও দ্বীপটি হামলার লক্ষ্যবস্তু হয়েছিল। এমনকি দ্বীপটি দখলে নেওয়ার সম্ভাবনা নিয়েও অতীতে মার্কিন কর্মকর্তাদের মধ্যে আলোচনা হয়েছে।
সোমবার দ্বীপটির আশপাশে একাধিক বিস্ফোরণের খবর পাওয়া যায়। তবে এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে চেয়ে যোগাযোগ করা হলেও যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) তাৎক্ষণিকভাবে কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি।
যুদ্ধের হুমকি কমালেও সামরিক বিকল্প খোলা রাখছেন ট্রাম্প
মঙ্গলবারের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর ইরানের বিরুদ্ধে বড় ধরনের সামরিক অভিযান পুনরায় শুরুর বিষয়ে সম্প্রতি প্রকাশ্যে নিজের অবস্থান কিছুটা নমনীয় করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
সোমবার সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ট্রাম্প বলেন, ‘ইরানের সঙ্গে আমাদের একটি যুদ্ধ হয়েছিল। আমরা জিতেছি। এটিকে যুদ্ধ বলা যায় কি না, সেটিও জানি না। কারণ কয়েক মাস ধরে আমরা কোনো লড়াই করছি না।’
নির্বাচনের পর ইরানে হামলার পরিকল্পনা আছে কি না, সরাসরি এমন প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প বলেন, ‘না।’
তবে দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নালকে মার্কিন প্রশাসনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ট্রাম্প এখনো সামরিক ও অর্থনৈতিক বিভিন্ন পদক্ষেপের কথা বিবেচনা করছেন। এর মধ্যে রয়েছে নতুন করে বিমান হামলা, আরও কঠোর নিষেধাজ্ঞা এবং ইরানের বাণিজ্যের ওপর অতিরিক্ত বিধিনিষেধ আরোপ।
এর আগে পত্রিকাটি জানিয়েছিল, সম্ভাব্য বড় ধরনের সামরিক অভিযানের প্রস্তুতির মধ্যে গত সপ্তাহে হোয়াইট হাউসে ট্রাম্পকে পরিস্থিতি সম্পর্কে অবহিত করেন যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ডের প্রধান অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপার।
এদিকে মধ্যপ্রাচ্যে অতিরিক্ত ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ও গোলাবারুদ পাঠিয়েছে মার্কিন সামরিক বাহিনী। নির্বাচনের পর স্বল্পস্থায়ী হলেও তীব্র সামরিক অভিযান শুরু হতে পারে, এমন পরিস্থিতির জন্য উপসাগরীয় দেশগুলোকে প্রস্তুত থাকার পরামর্শও দেওয়া হয়েছে।
কেশম দ্বীপের কাছে মাছ ধরার নৌকায় হামলার অভিযোগ
সর্বশেষ হামলার আগে সপ্তাহান্তেও কেশম দ্বীপের কাছে একটি ঘটনার খবর পাওয়া যায়।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের শনিবারের প্রতিবেদনে বলা হয়, ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন একটি প্রাদেশিক কর্মকর্তার বরাত দিয়ে অভিযোগ করেছে, দ্বীপটির কাছে দুটি মাছ ধরার নৌকায় হামলা চালিয়েছে মার্কিন বাহিনী।
ইরানি কর্মকর্তাদের দাবি, এতে একজন জেলে আহত হয়েছেন। তবে যুক্তরাষ্ট্র তাৎক্ষণিকভাবে এ ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেনি।
অন্যদিকে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) সোমবার দাবি করেছে, তাদের বাহিনী হরমুজ প্রণালির কাছে তিনটি মার্কিন ড্রোন ভূপাতিত করেছে। এর মধ্যে দুটি ছিল গোয়েন্দা নজরদারি ড্রোন, যেগুলো কেশম দ্বীপের দক্ষিণে ভূপাতিত করা হয়েছে বলে দাবি করা হয়।
আইআরজিসি-সংশ্লিষ্ট বার্তা সংস্থা তাসনিমের বরাত দিয়ে এ তথ্য জানিয়েছে ইরান ইন্টারন্যাশনাল। তবে মার্কিন সামরিক বাহিনী এসব দাবির বিষয়ে তাৎক্ষণিক কোনো নিশ্চিত তথ্য দেয়নি।
হরমুজ প্রণালি নিয়ে সমঝোতার চেষ্টা
সামরিক উত্তেজনার পাশাপাশি ওয়াশিংটন, তেহরান এবং আঞ্চলিক মধ্যস্থতাকারীদের মধ্যে নতুন করে কূটনৈতিক তৎপরতাও চলছে।
অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের (এপি) সোমবারের প্রতিবেদন অনুযায়ী, একটি সম্ভাব্য সমঝোতা নিয়ে আলোচনা করছেন আলোচকেরা। প্রস্তাবিত ব্যবস্থায় ইরান হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে হামলা বন্ধ করবে এবং এর বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বন্দরগুলোর ওপর থেকে অবরোধ তুলে নেবে।
তবে বৃহত্তর সমঝোতার অংশ হিসেবে ইরান নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং লেবানন পর্যন্ত বিস্তৃত যুদ্ধবিরতির দাবিও জানিয়েছে।
সোমবার তেহরানে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বলেন, এখন পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়ার দায়িত্ব যুক্তরাষ্ট্রের।
তিনি বলেন, ‘বল এখন যুক্তরাষ্ট্রের কোর্টে।’ এ সময় তিনি জানান, ইরানের দাবিগুলো ওয়াশিংটনকে স্পষ্টভাবে জানানো হয়েছে।
অন্যদিকে, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে একটি সমঝোতায় পৌঁছানোর সম্ভাবনা সম্পর্কে আশাবাদ প্রকাশ করেছেন ট্রাম্প ও ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স।
সোমবার তেলের দাম কমে যাওয়ার বিষয়টিও উল্লেখ করেন ট্রাম্প। তার মতে, আরেকটি বড় সামরিক সংঘাত ছাড়াই ইরান পরিস্থিতির সমাধান হতে পারে; বাজারে এমন প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে।
ইরানে নতুন হামলার আহ্বান নেতানিয়াহুর
এদিকে, মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর ইরানে নতুন দফায় হামলা চালানোর অনুমোদন দিতে ট্রাম্পের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের বরাত দিয়ে এ তথ্য জানা গেছে।
তবে এ ধরনের হামলার বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত নেননি ট্রাম্প।
সপ্তাহান্তে ইরান পরিস্থিতি নিয়ে নেতানিয়াহুর সঙ্গে কথা বলার বিষয়টি ট্রাম্প নিশ্চিত করেছেন। যদিও তাদের আলোচনার বিস্তারিত প্রকাশ করেননি তিনি।
অন্যদিকে, ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনিসহ দেশটির শীর্ষ নেতারা সতর্ক করে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র নতুন করে হামলা চালালে মধ্যপ্রাচ্যের বাইরেও এর প্রতিশোধমূলক প্রভাব ছড়িয়ে পড়তে পারে।
সব মিলিয়ে, হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল, ইরানের সামরিক সক্ষমতা, মার্কিন অবরোধ এবং পারমাণবিক কর্মসূচি ঘিরে দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা এখনো বহাল রয়েছে। একদিকে গোপন সামরিক অভিযান ও সম্ভাব্য নতুন হামলার প্রস্তুতি, অন্যদিকে যুদ্ধবিরতি ও কূটনৈতিক সমঝোতার আলোচনা; দুই বিপরীতমুখী পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে এগোচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংকট।