নারায়ণগঞ্জ শহরের কালিরবাজারে উচ্ছেদ অভিযান চালাতে গিয়ে খোদ সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক এডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খানের তোপের মুখে পড়ার ঘটনায় এখন রাজনীতির মাঠ থেকে শুরু করে চায়ের দোকান পর্যন্ত আলোচনার তুঙ্গে। তবে এই পুরো ঘটনায় সবচেয়ে বড় আলোচনার জন্ম দিয়েছে মহানগর বিএনপির সদস্য সচিব এডভোকেট আবু আল ইউসুফ খান টিপুর ভূমিকা।
উচ্ছেদ চলাকালে পুলিশ বিশৃঙ্খলাকারী হকারদের আটক করার পর টিপুর ঘটনাস্থলে যাওয়া এবং আটককৃতদের ছেড়ে দিতে বলা নিয়ে সাধারণ নগরবাসী ও ব্যবসায়ীদের মনে এখন নানামুখী প্রশ্নের তোড়জোড় শুরু হয়েছে। স্থানীয়দের সরাসরি অভিযোগ—বিএনপি নেতা টিপুর আশকারা ও আশ্রয়ের কারণেই নারায়ণগঞ্জের হকাররা আজ প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের ওপর চড়াও হওয়ার সাহস পাচ্ছে।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, গতকাল রোববার রাতে কালিরবাজার শায়েস্তা খাঁ সড়কে সিটি প্রশাসকের উপস্থিতিতে হকারদের তাণ্ডব ও উশৃঙ্খলতার পর পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে তিন হকারকে হেফাজতে নেয়। তবে ঘটনার পরই সেখানে হাজির হন মহানগর বিএনপির সদস্য সচিব এড. আবু আল ইউসুফ খান টিপু। তাকে দেখেই হকারদের পেশীশক্তি বেড়ে যায় বলে জানায় প্রত্যক্ষদর্শীরা। তিনি ঘটনাস্থলে গিয়ে পুলিশকে বলেন, পরিস্থিতি শান্ত করতে আটক হকারদের যেন ছেড়ে দেওয়া হয়।
উচ্ছেদের সময় বেপরোয়া হকারদের পক্ষে টিপুর এমন নমনীয় অবস্থান দেখে উপস্থিত সাধারণ জনগণ চরম ক্ষোভ প্রকাশ করেন। স্থানীয়দের মতে, যেখানে সাধারণ মানুষের হাঁটাচলার জায়গা সুগম করতে সিটি প্রশাসক সরাসরি মাঠে নেমেছেন, সেখানে দলের অন্য শীর্ষ নেতার এমন ভূমিকা হকারদের আরও উৎসাহিত করছে।
হকারদের প্রতি টিপুর শেল্টার ও আশকারার যে অভিযোগ বারবার উঠে তার নেপথ্যে অনুসন্ধান করতে গিয়ে জানা যায়, এর নেপথ্যে রয়েছে জেনারেটর ব্যবসার আড়ালে অবৈধ বিদ্যুৎ লাইনের চাঁদাবাজির এক তথ্য।
স্থানীয় ব্যবসায়ী ও পথচারীদের অভিযোগ, অতীতে সাবেক সংসদ সদস্য শামীম ওসমানের বিশ্বস্ত অনুসারী হিসেবে পরিচিত জাকিরুল আলম হেলাল যেভাবে হকারদের মাথায় তুলে রাখতেন এবং মদদ দিতেন, বর্তমানে টিপু ও তাঁর অনুসারীরা সেই একই জায়গা দখল করেছেন।
স্থানীয় সূত্রের দাবি, টিপুর ছোট ভাই বিল্লালসহ তাঁর অনুসারীরা শহরের চাষাড়া বালুর মাঠ এলাকায় রেলওয়ের খাস জমিতে জেনারেটর বসিয়ে রেখেছে। সেই জেনারেটর দিয়ে পুরো কালিরবাজার ও আশেপাশের ফুটপাতের হকারদের অবৈধ বিদ্যুতের সংযোগ দেওয়া হয়। প্রতিটি লাইট বাবদ হকারদের কাছ থেকে প্রতিদিন ৫০ থেকে ৬০ টাকা হারে প্রতিদিন প্রায় ৩০ থেকে ৫০ হাজার টাকা আদায় করা হয়। এই মোটা অঙ্কের অবৈধ চাঁদা ও ‘ক্যাশ টাকা’র বাণিজ্য টিকিয়ে রাখতেই টিপু হকারদের বিষয়ে সবসময় নরম নীতি অবলম্বন করেন বলে অভিযোগ এলাকাবাসীর। যদিও ৫ আগস্টের পর হকার শৃঙ্খলায় টিপুকে বেশ কয়েকবার প্রশাসনের সাথে দেখা গেছে, কিন্তু সাধারণ মানুষ এখন একে কেবলই “লোক দেখানো নাটক” বলে অভিহিত করছেন।
এদিকে, উত্থাপিত অভিযোগ ও ঘটনাস্থলের বিষয়ে সরাসরি জানতে চাওয়া হলে মহানগর বিএনপির সদস্য সচিব এড. আবু আল ইউসুফ খান টিপু তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা আশ্রয়ের বিষয়টি পুরোপুরি অস্বীকার করেন। তিনি উষ্মা প্রকাশ করে বলেন, “যারা বলে আমি হকারদের শেল্টার দেই, তাদের জন্মপরিচয় নিয়ে আমার সন্দেহ আছে। আমি কেন হকারদের শেল্টার দিতে যাবো?”
ঘটনাস্থলে যাওয়ার ব্যাখ্যা দিয়ে টিপু বলেন, “রাতে খবর পাই পুরান কোর্ট এলাকায় হকাররা সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসকের ওপর হামলা চালানোর চেষ্টা করছে। খবর পেয়েই আমি সেখানে যাই। পুলিশ যখন দুজনকে আটক করে, তখন পরিবেশ বেশ উত্তপ্ত ছিল। হকাররা অত্যন্ত উশৃঙ্খল গোষ্ঠী, তাই ওই সময় তাদের গ্রেফতার করলে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের আশঙ্কা ছিল। এজন্য পুলিশকে বলেছিলাম আগে পরিস্থিতি শান্ত করেন, পরে গ্রেফতারের বিষয়ে দেখা যাবে।”
পাশাপাশি সিটি প্রশাসক এড. সাখাওয়াত হোসেন খানের প্রশংসাও করেন টিপু। তবে নিরাপত্তার স্বার্থে প্রশাসকের প্রতি তাঁর একটি পরামর্শও ছিল। টিপু বলেন, “হকাররা কতটা হিংস্র আমরা সবাই জানি। তাই সিটি প্রশাসক এর প্রতি আমার আহ্বান থাকবে, নিজের সেফটির কথা চিন্তা করে রাতের বেলা পর্যাপ্ত পুলিশ ও লোকবল ছাড়া সরাসরি এমন ঝুঁকিপূর্ণ অভিযানে যেন উনি না যান।”
তবে, টিপুর এই ব্যাখ্যার পরও অসন্তোষ থামছে না নারায়ণগঞ্জের সাধারণ মানুষের। সচেতন মহলের মতে, এক নেতা উচ্ছেদ করছেন আর আরেক নেতা তাদের ছেড়ে দিতে বলছেন—এমন দ্বিচারিতা থাকলে নারায়ণগঞ্জ শহর কখনোই হকারমুক্ত করা সম্ভব নয়। তারা বলছেন, রাজনৈতিক মদদ ও জেনারেটরের অবৈধ বিদ্যুৎ বাণিজ্য বন্ধ না হলে বেপরোয়া হকারদের হাত থেকে কোনো প্রশাসকই রেহাই পাবেন না।