চাষাড়া বোমা হামলায় নিতেদের স্বজনরা আজও অপেক্ষায় বিচারের
নারায়ণগঞ্জের ইতিহাসে ১৬ জুন একটি শোকাবহ ও বেদনাময় দিন। ২০০১ সালের এই দিনে শহরের চাষাড়া এলাকায় আওয়ামী লীগ কার্যালয়ে ভয়াবহ বোমা হামলায় প্রাণ হারান ২০ জন। আহত হন অর্ধশতাধিক মানুষ। নিহত ও আহতদের স্বজনদের কাছে দিনটি এখনো এক গভীর ক্ষত, যার বেদনা সময়ের সঙ্গে মুছে যায়নি।
সেদিনের ভয়াবহ বিস্ফোরণে মুহূর্তেই আনন্দমুখর পরিবেশ পরিণত হয় মৃত্যুপুরীতে। চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে আর্তচিৎকার, রক্ত আর ধ্বংসস্তূপ। ঘটনাস্থলেই এবং হাসপাতালে নেওয়ার পর মারা যান ২০ জন। অনেকেই স্থায়ীভাবে পঙ্গুত্ববরণ করেন।
যেভাবে ঘটেছিল সেই ভয়াল হামলা
২০০১ সালের ১৬ জুন সন্ধ্যায় চাষাড়া আওয়ামী লীগ কার্যালয়ে স্থানীয় নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষ জড়ো হয়েছিলেন। হঠাৎ একটি শক্তিশালী বোমা বিস্ফোরণে কেঁপে ওঠে পুরো এলাকা। বিস্ফোরণের তীব্রতায় ছিন্নভিন্ন হয়ে যায় অনেকের শরীর। মুহূর্তেই সৃষ্টি হয় বিভীষিকাময় পরিস্থিতি।
হামলায় গুরুতর আহত হন তৎকালীন সংসদ সদস্য শামীম ওসমানসহ অসংখ্য মানুষ। অনেকে আজও শরীরে ও মনে সেই ক্ষতের ভার বহন করছেন।
যাদের জীবন থেমে গেছে সেই দিনেই
বোমা হামলায় নিহতদের মধ্যে ছিলেন ছাত্রনেতা, রাজনৈতিক কর্মী, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, ব্যবসায়ী এবং সাধারণ মানুষ। কেউ এসেছিলেন রাজনৈতিক কর্মসূচিতে, কেউ ব্যক্তিগত কাজে, আবার কেউ কেবল পথ চলতে গিয়ে এই মর্মান্তিক ঘটনার শিকার হন।
নিহতদের অনেকেই ছিলেন নিজ নিজ পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। তাদের মৃত্যুতে পরিবারগুলো নেমে আসে চরম আর্থিক ও সামাজিক সংকটে। অনেক সন্তান বড় হয়েছেন বাবাহারা হয়ে, অনেক মা হারিয়েছেন সন্তানকে, অনেক স্ত্রী হারিয়েছেন জীবনের অবলম্বন।
এখনো বয়ে বেড়াচ্ছেন সেই বিভীষিকা
হামলায় আহতদের মধ্যে অনেকে স্থায়ীভাবে পঙ্গু হয়ে যান। কারও হাত, কারও পা, আবার কেউ হারিয়েছেন স্বাভাবিক জীবনযাপনের সক্ষমতা। চিকিৎসা, পুনর্বাসন ও জীবিকার সংগ্রাম নিয়ে তাদের অনেকেই আজও মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন।
সেদিনের প্রত্যক্ষদর্শীরা এখনো স্মরণ করেন আগুনের গোলা, রক্তাক্ত দেহ আর আহতদের আর্তনাদের সেই বিভীষিকাময় দৃশ্য। তাদের ভাষায়, এটি ছিল নারায়ণগঞ্জের ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ মানবিক ট্র্যাজেডিগুলোর একটি।
স্বজনদের একটাই দাবি—প্রকৃত অপরাধীদের বিচার
ঘটনার দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও নিহতদের পরিবার ও আহতদের অনেকের মধ্যে এখনো বিচার প্রত্যাশা রয়ে গেছে। প্রতি বছর ১৬ জুন এলেই তারা প্রিয়জনদের স্মরণ করেন এবং ঘটনার সুষ্ঠু বিচার ও সত্য উদঘাটনের দাবি জানান।
যারা নিহত হন:
সেদিন নিহত হয়েছিলেন শহর ছাত্রলীগের সভাপতি সাইদুল হাসান বাপ্পী, সহোদর সরকারি তোলারাম কলেজ ছাত্র-ছাত্রী সংসদের জিএস আকতার হোসেন ও সঙ্গীত শিল্পী মোশাররফ হোসেন মশু, সঙ্গীত শিল্পী নজরুল ইসলাম বাচ্চু, ফতুল্লা থানা আওয়ামী লীগের তৎকালীন যুগ্ম সম্পাদক দেলোয়ার হোসেন ভাসানী, নারায়ণগঞ্জ থানা আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক এ বি এম নজরুল ইসলাম, স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতা সাইদুর রহমান সবুজ মোল্লা, মহিলা আওয়ামী লীগ নেত্রী পলি বেগম, ছাত্রলীগ কর্মী স্বপন দাস, কবি শওকত হোসেন মোক্তার, পান সিগারেট বিক্রেতা হালিমা বেগম, সিদ্ধিরগঞ্জ ওয়ার্ড মেম্বার রাজিয়া বেগম, যুবলীগ কর্মী নিধু রাম বিশ্বাস, আব্দুস সাত্তার, আবু হানিফ, এনায়েতউল্লাহ স্বপন, আব্দুল আলীম, শুক্কুর আলী, স্বপন রায় ও অজ্ঞাত এক মহিলা।