
নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ে বহু বছর ধরেই ত্রাসের আরেক নাম ছিল কুখ্যাত সন্ত্রাসী গিট্টু হৃদয়। হত্যা, হত্যাচেষ্টা, চাঁদাবাজি, মাদক কারবার, ভূমিদস্যুতা– এমন কোনো অপরাধ নেই যার সঙ্গে তার নাম জড়িত নয়। অসংখ্য মামলার আসামি হৃদয় অবশেষে ক্রসফায়ারে নিহত হলেও, তিনি রেখে গেছেন একটি শক্তিশালী সন্ত্রাসী সাম্রাজ্য। আর সেই সাম্রাজ্যের নিয়ন্ত্রণ বর্তমানে হাতে নিয়েছে তার দুলাভাই, পুলিশের তালিকাভুক্ত কুখ্যাত সন্ত্রাসী রাসেল।
স্থানীয় সূত্রের দাবি, হৃদয়ের জীবদ্দশায় তার সেকেন্ড ইন-কমান্ড হিসেবে পরিচিত ছিল রাসেল। হৃদয়ের মৃত্যুর পর সেই একই নেটওয়ার্ককে আরও বিস্তৃত ও শক্তিশালী করে তুলেছে সে। এলাকাবাসীর অভিযোগ যে অপরাধ সাম্রাজ্য পরিচালনার কারণে গিট্টু হৃদয় ক্রসফায়ারে নিহত হয়েছিলেন, সেই একই ধরনের অপরাধ এখন নির্ভয়ে, নির্লজ্জভাবে, প্রকাশ্য দিবালোকে চালিয়ে যাচ্ছে রাসেল।
বিগত কয়েক বছরে একের পর এক নৃশংস ঘটনায় উঠে এসেছে তার নাম। ২০২৪ সালের ২৮ নভেম্বর সোনারগাঁয়ের পিরোজপুর ইউনিয়নে শাহজাহান নামের এক যুবককে কুপিয়ে হত্যা, ৯ ডিসেম্বর সংবাদ প্রকাশের কারণে স্থানীয় এক সাংবাদিকের ওপর হামলা, ২০২৫ সালের ১২ জুলাই মোগরাপাড়া ইউনিয়নের জালাল টাওয়ারের পাশে এক ব্যক্তির পা কেটে দেওয়া, ২৩ জুলাই পৌরসভার দোয়েল এর সামনে এক যুবককে কুপিয়ে হত্যা, ১১ সেপ্টেম্বর চাঁদা দিতে অস্বীকার করায় ইমরান নামের এক যুবককে হত্যার চেষ্টা—এমন অগণিত ঘটনার সবকটিতেই রয়েছে রাসেলের সংশ্লিষ্টতা। ২৪ সেপ্টেম্বর মাদকের প্রতিবাদ করায় পাঁচজনকে কুপিয়ে হত্যার চেষ্টার ঘটনাও তারই নেতৃত্বে সংঘটিত হয়েছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। সর্বমোট দেড় ডজনেরও বেশি মামলার আসামি রাসেল বর্তমানে পুরো সোনারগাঁজুড়ে আতঙ্কের প্রতীকে পরিণত হয়েছে।
এলাকাবাসীর দাবি, পিরোজপুর ইউনিয়নের ১, ২ ও ৩ নম্বর ওয়ার্ডের কুরবানপুর, বটতলা বাজার, পাচানি বাজার, সোনারগাঁ চৌরাস্তা এবং আশপাশ অঞ্চলে রাসেলের আধিপত্য দিনের পর দিন আরও বৃদ্ধি পাচ্ছে। মাদক ব্যবসা, চাঁদাবাজি, দখলবাজি—এসবের পাশাপাশি তার রয়েছে নিজস্ব টর্চার সেল, যেখানে চাঁদা না দিলে কিংবা তার অপকর্মে বাধা দিলে মানুষকে নিয়ে গিয়ে অমানবিক নির্যাতন চালানো হয়। এসব নির্যাতনের শিকার বহু মানুষ আছেন, যারা ভয়ে মুখ খুলতে সাহস পান না।
রাসেলের অপরাধের পরিধি শুধু স্থলপথে সীমাবদ্ধ নয়। জানা গেছে, ঢাকা–চট্টগ্রাম মহাসড়কের কাচপুর থেকে মেঘনা পর্যন্ত অংশে তার নেতৃত্বে সক্রিয় রয়েছে একটি সংঘবদ্ধ ডাকাত চক্র। পাশাপাশি নৌপথেও এই চক্র নিয়মিত ডাকাতি চালায়। মহাসড়কের ডাকাতির ঘটনায় রাসেলের বেশ কয়েকজন সহযোগী গ্রেফতার হলেও মূলহোতা রাসেল থেকে যাচ্ছে ধরাছোঁয়ার বাইরে।
এছাড়া অভিযোগ রয়েছে, পিরোজপুর ইউনিয়নের সাবেক ২ নম্বর ওয়ার্ড মেম্বার মনিরের শেল্টারেই বড় হয়েছে রাসেলের দাপট। মনিরের চার ছেলের মধ্যে দুইজন বিভিন্ন মামলায় কারাগারে থাকলেও বাকি দুইজনকে নিয়ে রাসেল প্রকাশ্যে বেপরোয়া সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছে। তাদের ভয়ে এলাকাবাসী থানায় অভিযোগ করতেও সাহস পান না।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—এত মামলা, এত অপরাধ, এত অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও প্রশাসন কেন এখনো তার বিরুদ্ধে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করছে না? এলাকাবাসীর অভিযোগ, রহস্যজনক নীরবতা এবং কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তির ছত্রছায়ায় অপরাধ করেও বারবার রক্ষা পেয়ে যাচ্ছে রাসেল।
ক্রসফায়ারে নিহত গিট্টু হৃদয়ের অবসানে সোনারগাঁবাসী ভেবেছিল সন্ত্রাসী তৎপরতা কমবে। কিন্তু বাস্তবতা হলো—তার দুলাভাই রাসেলের হাতে সেই অপরাধ সাম্রাজ্য আরও সুসংগঠিত ও ভয়ংকর রূপ পেয়েছে। জনগণের প্রশ্ন—রাসেলের ত্রাসের রাজত্ব থেকে মুক্তি পেতে আরও কত জীবন ঝরতে হবে, এবং প্রশাসন কবে জেগে উঠবে?
আপনার মতামত লিখুন :